
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এ হয়রানি ও অনিয়মের শেষ নেই—এমন অভিযোগ করেছেন কারাগার থেকে বের হয়ে আসা কয়েকজন বন্দী ও সংশ্লিষ্টরা।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেন যোগদানের পর থেকেই কারাগারে দুর্নীতি ও অনিয়ম লাগামহীন হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ করেছেন বন্দী ও সংশ্লিষ্ট কয়েকজন। তাদের অভিযোগ, কারাগারে বন্দীদের আদালতসংক্রান্ত ও অন্যান্য কার্যক্রমে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থ লেনদেনের ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে।
কারাগারে আদালত থেকে একটি ওকালতনামা পাঠানো হয়। পরে কারাগারে বন্দীর স্বাক্ষর এবং জেলারের স্বাক্ষর শেষে সেটি আদালতে নিয়ে যেতে হয়। অভিযোগ রয়েছে, প্রতিটি ওকালতনামায় স্বাক্ষরের বিনিময়ে ২০০ টাকা করে নেওয়া হয়। প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০টি পর্যন্ত ওকালতনামা কারাগারে আসায় এ খাত থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ৭০ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। এমনকি ২০০ টাকা না দিলে ওকালতনামা ৩-৭ দিন পর্যন্ত আটকে রাখা হয়, কখনো আবার ওকালতনামা খোঁজেও পাওয়া যায় না।
শুধু ওকালতনামার স্বাক্ষর নয়, কোনো রাজনৈতিক মামলার আসামি জামিন পাওয়ার পর তাকে নির্ধারিত সময়ের আগেই বিশেষ ব্যবস্থায় কারাগার থেকে মুক্ত করে দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ক্ষেত্রে ৫০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত চুক্তি হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, ১৫ দিন পরপর বন্দীদের সঙ্গে তাদের স্বজনদের দেখা করার সুযোগ রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ের ১৫ দিন আগেই কোনো বন্দীর সঙ্গে দেখা করতে হলে ১ হাজার টাকা দিতে হয় বলে অভিযোগ।
অভিযোগ অনুযায়ী, এ ১ হাজার টাকা কারারক্ষীর মাধ্যমে নেওয়া হয়। এর মধ্যে জেলার পান ৮০০ টাকা এবং অবশিষ্ট ২০০ টাকা সংশ্লিষ্ট লেনদেনের সঙ্গে জড়িতদের মধ্যে বণ্টন করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কারারক্ষী কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়াকে বলেন, সৈয়দ জাবেদ হোসেন যোগদানের পর থেকেই কারাগারের অনিয়ম ও দুর্নীতি লাগামহীন হয়ে পড়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারাগারের বাইরে থেকে সাধারণভাবে বন্দীর সঙ্গে দেখা করতে হলে ১ হাজার টাকা দিতে হয়। আর অফিস কলে বন্দীর সঙ্গে দেখা করতে হলে দিতে হয় ৩ হাজার টাকা। একজন বন্দীর সঙ্গে একজন দেখা করলে ৩ হাজার টাকা এবং দুজন দেখা করলে ৬ হাজার টাকা দিতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারের ভেতরে বন্দীদের প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার জন্য একটি দোকান রয়েছে। দোকানটির নাম ‘পিসির বাজার’। সেখানে বন্দীদের জন্য সরকারি একটি মূল্য তালিকা রয়েছে। ওই মূল্য তালিকা অনুযায়ী বন্দীদের কাছে পণ্য বিক্রি করার নিয়ম।
তবে অভিযোগ রয়েছে, জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেন আসার পর সরকারি নিয়ম অনুযায়ী নয়, বরং নিজস্ব নিয়মে চলছে কারাগারের পিসির বাজার। বন্দীদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ২০ শতাংশ বেশি দামে পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে কারাগারের ভেতরে কথা বলা বা প্রতিবাদ করার সাহস কারও নেই বলেও অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বন্দী।
বন্দীদের অভিযোগ, পিসির বাজার নিয়ে কোনো বন্দী মুখ খুললে তাকে শাস্তির মুখে পড়তে হয়। এমনকি নারকেল গাছের সঙ্গে উল্টো দিকে দাঁড় করিয়ে হাত-পা গাছের সঙ্গে মিলিয়ে বেঁধে লাঠি দিয়ে মারধর করার অভিযোগও রয়েছে। জেলার উপস্থিতিতে সুবেদাররা নিরীহ বন্দীদের আঘাত করেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের ভেতরে সরাসরি টাকার লেনদেন চলে না। কারণ বন্দীরা পিসির বাজারের মাধ্যমে টাকা ব্যবহার করেন।
বন্দীর স্বজনরা বন্দীর নাম ও ঠিকানা উল্লেখ করে পিসির বাজারে কেস কার্ড অনুযায়ী রেজিস্টারে টাকা জমা দেন। এরপর যে বন্দীর নামে টাকা জমা হয়, কেবল সেই বন্দীই পিসির বাজার থেকে প্রয়োজনীয় বাজারসদাই করতে পারেন। তবে এই ব্যবস্থার মধ্যেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
প্রতি মাসে বন্দীদের ওয়ার্ড পরিবর্তন করা হয় , প্রতিটি ওয়ার্ডে জেলারের নির্ধারিত সুবেদার দায়িত্ব পালন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ওয়ার্ড বা সিট পরিবর্তনের জন্য বন্দীদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরনের সিগারেট ঘুষ হিসেবে নেওয়া হয়। কেউ ৫ প্যাকেট ‘বেনশন’, আবার কারও কাছ থেকে ২ প্যাকেট ‘ডার্বি’ সিগারেট নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।
বন্দীদের অভিযোগ, পিসির বাজারে গিয়ে শুধু বলা হয়—অমুক বন্দীকে ৫ প্যাকেট সিগারেট দিতে হবে। এরপর সঙ্গে সঙ্গেই ওই বন্দীর রেজিস্টার থেকে টাকার পরিমাণ কেটে সংশ্লিষ্ট সুবেদারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।
কারাগার থেকে বের হয়ে আসা কয়েকজন বন্দীও এসব অভিযোগের কথা জানিয়েছেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়াকে বলেন, সরকার ১৫ দিন পরপর বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার সুযোগ দেওয়ায় সেটিকে কেন্দ্র করে ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে তারা মনে করেন।
তাদের দাবি, যদি এক দিন পরপর বন্দীদের সঙ্গে স্বজনদের দেখা করার সুযোগ থাকত, তাহলে দেখা করার জন্য এভাবে টাকা দিতে হতো না।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলার সৈয়দ জাবেদ হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতেও তিনি ফোন করে কোনো বক্তব্য দেননি।
সিলেট কেন্দ্রীয় কারাগার-২-এর কথিত অনিয়ম ও দুর্নীতির আরও তথ্য নিয়ে পরবর্তী পর্ব আসছে।