জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ প্রতিনিধি
বর্ষা এলেই ফেনীর ফুলগাজী আর পরশুরামের মানুষের চোখে ঘুম উবে যায়। মেঘের ডাক শুনলেই বুক কাঁপে মুহুরী নদীর তীরের বাসিন্দাদের। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। কয়েক দিনের টানা বৃষ্টি আর ভারতের উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে ফুলে-ফেঁপে উঠছে মুহুরী নদী। মাত্র ৯ ঘণ্টার ব্যবধানে নদীর পানি বেড়েছে ২ মিটারেরও বেশি। পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও, যেভাবে বাড়ছে তাতে যেকোনো মুহূর্তে বাঁধ ভেঙে লোকালয় প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কায় দিন কাটছে হাজারো মানুষের।
মাত্র ৯ ঘণ্টায় ২.১০ মিটার বৃদ্ধি: আতঙ্কের মূল কারণ
পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) তথ্য অনুযায়ী, সোমবার (১৩ জুলাই) সকাল ৬টায় নদীর পানির স্তর ছিল ৯.৩৫ মিটার। কিন্তু দুপুর ৩টার মধ্যেই তা ২.১০ মিটার বেড়ে দাঁড়ায় ১১.৪৫ মিটারে। বিপৎসীমা (১২.৫৫ মিটার) থেকে পানি এখন মাত্র ১.১০ মিটার নিচে রয়েছে। উজানে ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে যেকোনো সময় এই সীমা অতিক্রম করতে পারে নদী।
পাউবোর ফেনীর নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মনিরুল ইসলাম জানান:
”এবারের পানি বৃদ্ধির ধরণ কিছুটা ব্যতিক্রম। গত কয়েক দিন পানি বাড়লেও পরে তা কমে যাচ্ছিল। তবে সোমবার সকাল থেকে পানি যেভাবে দ্রুত বাড়ছে, তা উদ্বেগের। পানি বিপৎসীমা পার হলে বাঁধের কিছু জায়গায় নতুন করে ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।”
”বর্ষা এলেই আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়”
বিগত দুই বছরের ভয়াবহ বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি শ্রীপুর, জগতপুরসহ নদীতীরবর্তী বিভিন্ন এলাকার মানুষের। ফুলগাজী উপজেলার উত্তর শ্রীপুর এলাকার বাসিন্দা মো. মোর্শেদ তার ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন, “বর্ষা এলেই আমাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায়। পানি এখনো বিপৎসীমার নিচে থাকলেও ভারতের ত্রিপুরায় ভারী বৃষ্টি হলে যেকোনো সময় পাহাড়ি ঢল নেমে পরিস্থিতির অবনতি হতে পারে।”
একই ক্ষোভ জগতপুরের বাসিন্দা নূর নবীরও। তিনি জানান, গত কয়েক বছরের বন্যায় তারা নিঃস্ব প্রায়। ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধগুলো দ্রুত স্থায়ীভাবে সংস্কার করা না হলে এবারও রক্ষা পাওয়া কঠিন। তাই এলাকার ভুক্তভোগী মানুষের দাবি—সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে দ্রুত টেকসই বাঁধের কাজ শুরু হোক।
সমাধান যেখানে আটকে আছে: একনেক প্রকল্পের দ্রুত বাস্তবায়ন দাবি
নদীতীরবর্তী মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধানের জন্য সম্প্রতি জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রায় ১ হাজার ৫৪২ কোটি ১৬ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ‘মুহুরী-কহুয়া বন্যা নিয়ন্ত্রণ, নিষ্কাশন ও সেচ প্রকল্পের পুনর্বাসন (প্রথম পর্যায়)’ শীর্ষক এই প্রকল্পটি দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি এখন ফেনীবাসীর মুখে মুখে। স্থানীয়দের মতে, এই প্রকল্পের কাজ মাঠপর্যায়ে শুরু হলে তাদের বছরের পর বছর ধরে চলা এই আতঙ্ক ও ভোগান্তির অবসান ঘটবে।
আবহাওয়া ও বর্তমান প্রস্তুতি
ফেনী আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মজিবুর রহমান জানিয়েছেন, সোমবার দুপুর ৩টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে আশার কথা হলো, আগামী কয়েক দিনে বৃষ্টির প্রবণতা কিছুটা কমতে পারে।
এদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলা ও বাঁধ রক্ষায় তাদের প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এবং জরুরি সামগ্রী (জিও ব্যাগ ইত্যাদি) মজুত রয়েছে। তবে স্থানীয়দের মতে, জরুরি সাময়িক প্রস্তুতির চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই বাঁধ নির্মাণই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ প্রতিনিধি