
বাংলাদেশে প্রতিবছর পানিতে ডুবে ১৮ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়, যার বড় একটি অংশই শিশু। প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৫০ জন পানিতে ডুবে প্রাণ হারান। বিশেষ করে ১ থেকে ৪ বছর বয়সী শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তবে পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা হলে এ ধরনের মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।
শনিবার (২৫ জুলাই) আন্তর্জাতিক পানিতে ডুবে মৃত্যু প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে চট্টগ্রামের পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে আয়োজিত ‘সম্মিলিত প্রচেষ্টায় জোয়ার রোধ করা যায়’ শীর্ষক সেমিনারে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়। শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা জোরদারের লক্ষ্যে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে বেসরকারি সংগঠন ডিজাস্টার অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (ড্যাডো)।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং ড্যাডোর প্রধান নির্বাহী অধ্যাপক মোহাম্মদ ইদ্রিস আলম। তিনি বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বজুড়ে প্রায় তিন লাখ মানুষ পানিতে ডুবে মারা যান। বাংলাদেশে এই সংখ্যা ১৮ হাজারেরও বেশি। অধিকাংশ দুর্ঘটনা ঘটে বাড়ির আশপাশের পুকুর, ডোবা, খাল ও অন্যান্য জলাশয়ে।
তিনি আরও বলেন, শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যুর বেশির ভাগ ঘটনাই সকাল ৮টা থেকে দুপুর ১টার মধ্যে ঘটে, যখন পরিবারের সদস্যরা বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত থাকেন। তবে এ ধরনের দুর্ঘটনার দায় কেবল পরিবারের একজন সদস্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়। একটি শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পরিবার, প্রতিবেশী, স্থানীয় সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সরকার ও রাষ্ট্র—সবার যৌথ দায়িত্ব।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ড্যাডোর সভাপতি ব্যারিস্টার আফরোজা আক্তার। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পোর্ট সিটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী এবং চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) চেয়ারম্যান বেলায়েত হোসেন।
বেলায়েত হোসেন বলেন, পরিকল্পিত নগরায়ণ এবং শিশুবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলা শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। জলাশয়ের চারপাশে নিরাপত্তাবেষ্টনী, সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড এবং নিরাপদ জনপরিসর তৈরিতে সরকারি ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
উপাচার্য মোহাম্মদ তৈয়ব চৌধুরী বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গবেষণা, সচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবামূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে শিশু সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে আনসার ও ভিডিপির পরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, শিশুদের পানিতে ডুবে মৃত্যু এখন জাতীয় উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় সরকার, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাধারণ মানুষের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
এদিকে দিবসটি উপলক্ষে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে লাইফ সেভিং সোসাইটি চট্টগ্রামের উদ্যোগে পৃথক আলোচনা সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সেখানে বক্তারা শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সাঁতার শেখানো, পানিতে নিরাপত্তা বিষয়ে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং জরুরি প্রাথমিক চিকিৎসার প্রশিক্ষণকে বাধ্যতামূলক করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
বক্তারা জাতীয় শিক্ষাক্রমে পানিতে নিরাপত্তা, সাঁতার শিক্ষা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলের পুকুর ও জলাশয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনী স্থাপন এবং পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যাপ্ত লাইফগার্ড, প্রশিক্ষিত উদ্ধারকর্মী ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জাম নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
আলোচনা সভায় পানিতে ডুবে স্বজন হারানো কয়েকজন অভিভাবকও নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তারা বলেন, সময়মতো সচেতনতা ও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব।
