
অপহরণ, ধর্ষণ, হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগ; আতঙ্কে সাক্ষীরা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
নিজস্ব প্রতিবেদক | অনুসন্ধানী টিম, দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার পূর্ব পিটুয়ারকান্দী গ্রামের ১২ বছর বয়সী এতিম কিশোরী ছামিরুন আক্তার হত্যা মামলার তদন্ত ঘিরে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া-র দীর্ঘ অনুসন্ধান। প্রায় ৫৮ দিন গোপন অনুসন্ধান ও পরবর্তী মাঠপর্যায়ের তথ্য সংগ্রহে উঠে এসেছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পারিপার্শ্বিক তথ্য, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা এবং স্থানীয়দের অভিযোগ; যা মামলার প্রকৃত রহস্য উদঘাটনে তদন্তকারী সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে।
তবে প্রতিবেদনে উল্লেখিত ব্যক্তি ও ঘটনাসংশ্লিষ্ট অভিযোগগুলোর বিষয়ে তদন্তকারী সংস্থা এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছেনি। ফলে এসব অভিযোগ আদালতে প্রমাণিত নয়।
মামলার নথি অনুযায়ী, আজমিরীগঞ্জ থানার মামলা নম্বর-০১, জিআর নম্বর-২৭, রুজুর তারিখ ২ এপ্রিল ২০২৬; ধারা ৩০২/২০১/৩৪, পেনাল কোড-১৮৬০। অভিযোগ, অপহরণের পর শিশুটিকে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয়। পরে প্রমাণ গোপনের উদ্দেশ্যে হাত-পা বেঁধে তার মরদেহ কালনী নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। পরদিন নদীতে ভাসমান অবস্থায় মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।
দুর্গম হাওরের নীরবতা ভেঙে দেওয়া হত্যাকাণ্ড
ঘটনাস্থল পূর্ব পিটুয়ারকান্দী গ্রামটি হাওরবেষ্টিত দুর্গম এলাকা। বর্ষা মৌসুমে চারদিকে পানি থাকায় নৌকাই একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, সন্ধ্যার পর গ্রাম প্রায় নিস্তব্ধ হয়ে যায়। সেই সুযোগেই সংঘটিত হয় আলোচিত এই হত্যাকাণ্ড।
তৎকালীন সময় ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠায় আজমিরীগঞ্জ থানা পুলিশ। দায়িত্বে থাকা তৎকালীন ওসি এবং ঘটনাস্থলে উপস্থিত স্থানীয়দের বক্তব্যে উঠে এসেছে মরদেহ উদ্ধারের বিভীষিকাময় চিত্র।
রাত ৩টার রহস্য
অনুসন্ধানে সবচেয়ে আলোচিত তথ্যগুলোর একটি এসেছে সুনামগঞ্জের শাল্লা উপজেলার ইসলামপুর গ্রামের এক দোকানদারের কাছ থেকে।
তার দাবি, ঘটনার রাতে আনুমানিক রাত ৩টা থেকে ৪ টার মধ্যেবর্তী সময়ের দিকে পূর্ব পিটুয়ারকান্দী গ্রামের লিটন মিয়া ও তার কয়েকজন সহযোগী তার বন্ধ দোকানে গিয়ে দরজায় জোরে ধাক্কা দেন। তিনি ঘুম থেকে উঠে দোকান খুললে তারা কোল্ড ড্রিংকসসহ কিছু পণ্য কিনে দ্রুত চলে যান।
দোকানদারের ভাষ্য অনুযায়ী, লিটনের চেহারায় ছিল চরম অস্থিরতা ও আতঙ্কের ছাপ। নিজ এলাকায় দোকান থাকা সত্ত্বেও গভীর রাতে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরের দোকানে যাওয়ার বিষয়টি তার কাছে তখন থেকেই সন্দেহজনক মনে হয়।
পরবর্তীতে ছামিরুনের মরদেহ উদ্ধারের পর তিনি বিষয়টি কয়েকজন বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে জানান। তবে তার অভিযোগ, বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। নিরাপত্তার অভাবে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি।
ভোরে নদীর পাড়ে সন্দেহজনক উপস্থিতি
নিরাপত্তার স্বার্থে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় ব্যক্তি অনুসন্ধানী টিমকে জানান, ঘটনার পরদিন ভোরে নদীর তীরসংলগ্ন এলাকায় লিটনকে একা বসে থাকতে দেখা যায়। সকাল ৫টা ও পরে সকাল ৭টার দিকে দুইজন পৃথক ব্যক্তি একই ধরনের তথ্য দিয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
এ তথ্যের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
মৃত ভেড়া নিয়েও প্রশ্ন
ঘটনার পরদিন একই এলাকার একটি ওলটপালট ধানক্ষেতে একটি মৃত ভেড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের দাবি, ভেড়াটি লিটনের আপন ফুফাতো ভাই বর্তমান এ মামলার আসামি হিসেবে জেলে থাকা আবুনির। পরদিনই নদীতে ভেসে ওঠে ছামিরুনের মরদেহ। ঘটনাক্রমকে ঘিরে এলাকাজুড়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
গ্রামজুড়ে আতঙ্ক
অনুসন্ধানে বহু স্থানীয় বাসিন্দা দাবি করেছেন, গ্রামের একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি লিটনের বিরুদ্ধে অতীতেও হত্যা মামলাসহ বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও তিনি সব সময় প্রভাব বজায় রেখেছেন। ফলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে অধিকাংশ মানুষ ভয় পান।
মামলার নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৭ সালে আজমিরীগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলাতেও তার নাম রয়েছে। ২০১৭ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি, আজমীরগঞ্জ থানায় দায়ের হওয়া একটি হত্যা মামলা। যার এফআইআর নম্বর ছয়, জিআর নম্বর এগারো। দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৬, ৩০৭ থেকে শুরু করে সরাসরি ৩০২—অর্থাৎ, খুনের ধারা রয়েছে এই আসামির বিরুদ্ধে। তিনি—আজমীরগঞ্জের বহুল আলোচিত লিটন।
শুধু এই একটি মামলাই নয়, তার বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক অপরাধের খতিয়ান।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।
পাল্টা অভিযোগও রয়েছে
অন্যদিকে, এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বাদী পক্ষের ভগ্নিপতি আল আমিনের বিরুদ্ধে পাঁচ লাখ টাকা নিয়ে ‘মামলা বাণিজ্যের’ অভিযোগ তুলেছে প্রতিপক্ষের একটি অংশ।
এ বিষয়ে আল আমিন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এসব অভিযোগ উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং প্রকৃত খুনিদের আড়াল করতেই এমন অপপ্রচার চালানো হচ্ছে।
স্থানীয় অনেক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রকৃত অপরাধীদের আড়াল করার পাশাপাশি নিরপরাধ মানুষকে মামলায় জড়ানোরও চেষ্টা চলছে।
তদন্তে নতুন সূত্র?
দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার অনুসন্ধানী টিম দীর্ঘদিন তথ্য সংগ্রহের পর প্রকাশ্যে এলাকায় অনুসন্ধানে গেলে কয়েকজন সন্দেহভাজন ব্যক্তি এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন। যদিও এর স্বাধীন যাচাই সম্ভব হয়নি।
অনুসন্ধানে উঠে আসা বিভিন্ন তথ্য, সাক্ষ্য, স্থানীয়দের বক্তব্য এবং ঘটনাপ্রবাহ তদন্তকারী সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
ছামিরুনের পরিবারসহ স্থানীয়দের একটাই দাবি—প্রভাবমুক্ত, বিজ্ঞানসম্মত ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনা হোক। একই সঙ্গে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন এবং গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীরা যেন নিরাপত্তা পান, সেই দাবিও জানিয়েছেন তারা।
অনুসন্ধান পরিচালনা: মোঃ আলী হোসেন সরকার, ক্রাইম চিফ এডিটর, দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া
অনুসন্ধানী টিম: শাওন আহমেদ সা’দ, রিয়াজউদ্দিন, মামুনুর রশিদ, লিটন পাঠান, জামিল, রোহান ও আনোয়ার হোসেন।
চিত্রগ্রহণ: রাসেল হাওলাদার ও রাজিব।