ঢাকা
২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
শিরোনাম
এক মন্ত্রণালয়ে একাধিক প্রতিমন্ত্রী—আইনে কি অনুমোদন আছে? মুহুরী নদীর পানি বাড়ছে হু হু করে: বাঁধ ভাঙার আশঙ্কায় নির্ঘুম ফেনীবাসী ​ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করা হচ্ছে যমুনা গ্রুপের প্রতিষ্ঠাতা নুরুল ইসলামকে ঢাকার পাশে ঘন ঘন ভূমিকম্প: বড় বিপদের আগাম বার্তা যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটিতে সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন সিলেটের মোহাম্মদ মাকসুদ আহমেদ তাহিরপুরে হত্যা করে লাশ গুমের ঘটনায় পলাতক আসামি নারায়ণগঞ্জে গ্রেফতার বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি: ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খোলা থাকবে সন্ধ্যা ৭টা পর্যন্ত বিরল সূর্যগ্রহণে ইউরোপে উন্মাদনা হবিগঞ্জ কিশোরীকে ধর্ষণের অভিযোগ চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতায় বিশাল ক্ষতিপূরণ পেতে যাচ্ছে ইরান

হবিগঞ্জে ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বন্ধ অস্ত্রোপচার বাড়তি ঝুঁকিতে রোগিরা

লিটন পাঠান, হবিগঞ্জ জেলা প্রতিনিধি

বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিবেদক
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬   ৪১ বার পঠিত
হবিগঞ্জে ৮টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বন্ধ অস্ত্রোপচার বাড়তি ঝুঁকিতে রোগিরা

হবিগঞ্জ জেলার উপজেলা স্বাস্থ্যসেবা গুলোতে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে অস্ত্রোপচার ব্যবস্থায়। ৯টি উপজেলার মধ্যে ৮ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অস্ত্রোপচার বন্ধ রয়েছে। নিয়মিত অস্ত্রোপচার হচ্ছে শুধু মাধবপুরে। বাকি আটটি হাসপাতালে অস্ত্রোপচার কার্যক্রম কার্যত বন্ধ। এসব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোতে কাঙ্খিত সেবা না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ রোগিরা। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও চিকিৎসক সংকট, কোথাও নেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এসব স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এমন পরিস্থিতি তৈরী হয়েছে। ফলে অ্যাপেন্ডিসাইটিস, হার্নিয়াসহ সাধারণ অস্ত্রোপচারের রোগীকেও যেতে হচ্ছে জেলা সদর কিংবা সিলেটের হাসপাতালে। এতে রোগীর চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি জরুরি রোগীদের ক্ষেত্রে তৈরি হচ্ছে বাড়তি ঝুঁকি। শুধু চিকিৎসক নয়, অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীর ক্ষেত্রেও বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, মাধবপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৩৩টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ৭০ জন, চুনারুঘাটে ১৩২টি পদের মধ্যে কর্মরত ৫৮ জন, নবীগঞ্জে ১৩২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৫৭ জন, বানিয়াচংয়ে ১২২টি পদের বিপরীতে কর্মরত ৬৩ জন, লাখাইয়ে ৮০টির বিপরীতে ৩৯ জন, বাহুবলে ৮২টির বিপরীতে ৪২ জন।
আজমিরীগঞ্জে ৭১টির বিপরীতে ৩৭ জন এবং শায়েস্তাগঞ্জে ২৭টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ১২ জন। শুধু উপজেলা নয়, ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতেও একই চিত্র। অনুমোদিত পদের বিপরীতে বিপুলসংখ্যক চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী না থাকায় প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবাও ব্যাহত হচ্ছে। চিকিৎসার অবকাঠামো থাকলেও জনবল না থাকায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবার সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন জেলার বিপুলসংখ্যক মানুষ। স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হবিগঞ্জের ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসকের অনুমোদিত পদ ৯৫টি। এর বিপরীতে কর্মরত আছেন ৫৪ জন। অর্থাৎ ৪১টি পদই শূন্য, যা মোট অনুমোদিত পদের প্রায় ৪৩ শতাংশ। চিকিৎসক সংকটের পাশাপাশি কর্মকর্তা-কর্মচারীর পদও দীর্ঘদিন ধরে খালি পড়ে আছে। বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে১১টি চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র চারজন। চুনারুঘাটে ১১টি পদের বিপরীতে পাঁচজন এবং মাধবপুরে ১১টি পদের বিপরীতে কর্মরত ছয়জন। এ ছাড়া লাখাই, শায়েস্তাগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জে চারটি করে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন করে। নবীগঞ্জ ও বানিয়াচংয়ে চারটি পদের বিপরীতে কর্মরত দুজন করে। কোনো কোনো হাসপাতালে অনুমোদিত চিকিৎসক পদের অর্ধেকেরও কম জনবল রয়েছে।
ফলে সীমিত জনবল দিয়েই বহির্বিভাগ, জরুরি বিভাগ, অন্তর্বিভাগ, মাতৃস্বাস্থ্য, টিকাদানসহ নানা ধরনের সেবা চালাতে হচ্ছে। অতিরিক্ত দায়িত্বের চাপে কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ওপরও বাড়ছে চাপ। জেলার ৯টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মোট শয্যা ৪৩১টি। অথচ অনেক হাসপাতালেই অনুমোদিত শয্যার দ্বিগুণের কাছাকাছি রোগী ভর্তি থাকছেন নিয়মিতই। এ ছাড়া কয়েকটি উপজেলায় ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে ৫০ শয্যার কার্যক্রম। এর মধ্যে রয়েছে বানিয়াচং, আজমিরীগঞ্জ ও লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের নাম। বাহুবল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ৫০ শয্যার হলেও প্রতিদিন সেখানে ভর্তি থাকেন প্রায় ১১০ থেকে ১২০ জন রোগী। মাধবপুরেও প্রায় একই পরিস্থিতি। চুনারুঘাট ও বানিয়াচংয়ে প্রতিদিন ৯০ থেকে ১০০ জন, লাখাই, নবীগঞ্জ ও আজমিরীগঞ্জে ৮০ থেকে ৯০ জন এবং শায়েস্তাগঞ্জে ৭০ থেকে ৮০ জন রোগী ভর্তি থাকেন। ফলে কোথাও একটি শয্যায় একাধিক রোগীকে থাকতে হচ্ছে, আবার কোথাও মেঝেতে থেকেও চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। আর অতিরিক্ত রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসকদের পক্ষে প্রত্যেক রোগীকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। সংকট শুধু উপজেলা হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নয়।
ইউনিয়ন পর্যায়ের সরকারি স্বাস্থ্যসেবাতেও জনবল ঘাটতি রয়েছে। জেলার বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে মেডিকেল অফিসার/সহকারী সার্জন সমমানের ২১৬টি পদ অনুমোদিত। এর বিপরীতে পদায়ন রয়েছে ৯৩টি এবং কর্মরত ৭৯ জন। অর্থাৎ অনুমোদিত পদের অর্ধেকেরও বেশি পদই পূরণ হয়নি। মাধবপুরে ২৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত ১৪টি, চুনারুঘাটে ২৮টির বিপরীতে ১২টি, বাহুবলে ২৮টির বিপরীতে ১০টি, বানিয়াচংয়ে ৩০টির বিপরীতে ১৪টি, আজমিরীগঞ্জে ১৯টির বিপরীতে ৮টি, এবং লাখাইয়ে ২৪টির পদের বিপরীতে কর্মরত ১১ জন। এ ছাড়া হবিগঞ্জ সদরে ৯টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত সাতজন। নবীগঞ্জসহ অন্যান্য উপজেলাতেও কমবেশি চিকিৎসক ঘাটতি রয়েছে। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে মোট ৫৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ২৩ জন। লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. কাজী শামছুল আরেফীন জানান, লাখাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে দীর্ঘদিন ধরে ৩১ শয্যার জনবল দিয়ে ৫০ শয্যার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে শূন্য পদ পূরণ না হওয়ায় কর্মরত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
দ্রুত চিকিৎসক, অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ, মেডিকেল টেকনোলজিস্টসহ প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা গেলে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা সম্ভব। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সভাপতি অ্যাডভোকেট ত্রিলোক কান্তি চৌধুরী বিজন বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গ্রামীণ জনগণের সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রথম গুরুত্বপূর্ণ আশ্রয়স্থল। এই স্তরে চিকিৎসা কার্যক্রম দুর্বল হয়ে পড়লে রোগীর চাপ স্বাভাবিকভাবেই জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ের হাসপাতালে গিয়ে পড়ে। তিনি বলেন, উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসক সংকট, বিশেষজ্ঞের অনুপস্থিতি, অ্যানেস্থেশিয়া চিকিৎসকের ঘাটতি, অস্ত্রোপচার বন্ধ, শয্যার তুলনায় অতিরিক্ত রোগী এবং ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে বিপুলসংখ্যক শূন্য পদ সব মিলিয়ে জেলার সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার বড় একটি অংশ কার্যত সক্ষমতার নিচে কাজ করছে।  দ্রুত শূন্য পদ পূরণ, উপজেলা হাসপাতালে প্রয়োজন অনুযায়ী সার্জন ও অ্যানেস্থেশিয়া বিশেষজ্ঞ পদায়ন, নার্স ও টেকনোলজিস্ট নিয়োগ এবং প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সচল করা জরুরি।
তা না হলে অবকাঠামো ও সরকারি বিনিয়োগ থাকলেও প্রত্যন্ত এলাকার মানুষ কাঙ্খিত স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিতই থাকবেন।
হবিগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. রত্মদীপ বিশ্বাস বলেন, আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের বরাবরে বারবারই চিঠি দিচ্ছি। এর আলোকে মাঝে মাঝে একজন-দুইজন করে পদায়ন করা হচ্ছে। এ ছাড়া কয়েকটি হাসপাতালে ৩১শয্যার জনবল দিয়ে ৫০ শয্যার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, এসব বিষয়ও কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। তিনি জানান, জুনিয়র কনসালটেন্ট, অ্যানেস্থেশিয়া, গাইনি ও সার্জারি ডাক্তারের জন্য পত্র প্রেরণ করা হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত পদায়ন হয়নি। পদায়ন হলে বাকি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতেও অস্ত্রোপচার চালু হবে।

Facebook Comments Box
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
SuMoTuWeThFrSa