
যমুনার প্রবল স্রোত ও ভয়াল ভাঙন আজ গাইবান্ধা, বগুড়া এবং সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ জনপদকে অভিশপ্ত করে তুলেছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই এই অঞ্চলের মানুষ আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। তাদের রাতের ঘুম হারাম হয়ে যায় নদীর গর্জনে। প্রাণপ্রিয় বাড়িঘর, ফসলি জমি, স্কুল, মসজিদ, মন্দির—সবকিছুই যমুনার গর্ভে বিলীন হতে থাকে। স্থানীয়রা নিজেদের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে প্রাণপণ লড়াই করলেও প্রকৃতির কাছে তারা প্রায়শই পরাজিত।
গাইবান্ধার ফুলছড়ি, সাঘাটা, বগুড়ার ধুনট এবং সিরাজগঞ্জের চৌহালি, শাহজাদপুর এলাকাগুলো ভাঙনের সবচেয়ে ভয়াবহ অবস্থার শিকার। ধুনট উপজেলার শহরাবাড়ি এলাকায় নদীর ভাঙন এতটাই তীব্র হয়েছে যে সেখানে গড়ে তোলা সাময়িক বাঁধও হুমকির মুখে পড়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, এই বাঁধ যদি ভেঙে যায় তাহলে প্রায় এক লক্ষ একর জমি পানির নিচে তলিয়ে যাবে। এর মধ্যে রয়েছে কৃষিজমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার ও অসংখ্য বসতবাড়ি।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি সত্ত্বেও, পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) নদীভাঙন রোধে টেকসই উদ্যোগ নেয়নি। কিছু এলাকায় কেবল অস্থায়ী জিও ব্যাগ ফেলে বা কাঁচা বাঁধ নির্মাণ করে দায় সারা হয়েছে। বাস্তবতা হলো, এই ব্যবস্থা নদীর প্রবল স্রোতের কাছে টিকতে পারে না। বর্ষার সময় বাঁধের ফাঁকফোকর দিয়ে পানি চুঁইয়ে চুঁইয়ে ঢুকে এবং তা আরও ভাঙনের সৃষ্টি করে। এলাকাবাসী মনে করেন, পাউবোর দৃষ্টি ছিল বর্ষা মৌসুমে কোনোভাবে পরিস্থিতি সামাল দিয়ে নিজেদের দায়িত্ব শেষ করা। ফলে আজ ধুনটের শহরাবাড়ি থেকে শুরু করে সিরাজগঞ্জের কাজীপুর পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা চরম ঝুঁকিতে।
নদী থেকে অপরিকল্পিতভাবে বালু উত্তোলন ভাঙনের জন্য বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুষ্টিমেয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি প্রশাসনের চোখের সামনে অথবা তাদের মদদে ড্রেজার মেশিন বসিয়ে যত্রতত্র বালু তুলছেন। ফলে নদীর স্বাভাবিক গতিপথ পরিবর্তিত হয়েছে। যেসব এলাকায় আগে পানি ধীরে চলত, এখন সেখানে প্রবল স্রোত তৈরি হয়েছে। নদীর পাড় দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ফলশ্রুতিতে ভাঙন তীব্রতর হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন কখনো কখনো অভিযান চালালেও, তা ছিল লোক দেখানো। ফলে ভাঙন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, যমুনার ভাঙন রোধে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া সাময়িক উদ্যোগ কার্যকর হবে না। প্রয়োজন সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা, যেখানে নদীর প্রবাহ, চর গঠন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ এবং সুরক্ষা বাঁধের প্রকৃত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প হাতে নিতে হবে। এছাড়া নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে টেকসই বাঁধ নির্মাণের আহ্বান জানাচ্ছেন পরিবেশবিদ ও নদী বিশেষজ্ঞরা।
নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মানবেতর জীবন যাপন করছে। কেউ খোলা আকাশের নিচে, কেউবা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে ঠাঁই নিয়েছে। বর্ষা মৌসুমে সরকারি ত্রাণের জন্য তাদের দীর্ঘক্ষণ লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, অথচ সেই সহায়তাও প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। অনেকেরই জমি, বাড়ি, ব্যবসা—সবকিছু হারিয়ে গেছে। নতুন করে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজন ছিল সহায়ক উদ্যোগ, কিন্তু সেই সুযোগ তারা পায়নি। বিশেষ করে অনেক শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ হারিয়ে ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
যমুনার এই ভয়াল ভাঙন কেবল প্রকৃতির খেয়াল নয়, মানবসৃষ্ট অব্যবস্থাপনারও ফল। পরিকল্পনাহীন উন্নয়ন, দায়িত্বহীন প্রশাসন এবং স্বার্থান্বেষী মহলের কারণে আজ গাইবান্ধা, বগুড়া, সিরাজগঞ্জের বিস্তীর্ণ অঞ্চল বিপন্ন। এখনই সময় দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি নিয়ে টেকসই নদী ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া। নইলে প্রতি বছর এই ভাঙনের গল্প নতুন করে লিখতে হবে, আর হাজার হাজার মানুষকে আবারও শূন্য হাতে পথে নামতে হবে।
লেখক: শিক্ষক, সাংবাদিক এবং কলামিস্ট।