সকালবেলা জানালার গ্রিল ধরে একমনে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকা সেই শিশুটি—যে ডাকলে সাড়া দেয় না, কিন্তু বৃষ্টির শব্দের ছন্দে আপনমনে দোল খায়। সে অন্য কোনো জগতের নয়; সে আমাদেরই চেনা পৃথিবীর একজন, যার মস্তিষ্কের মানচিত্রটা হয়তো একটু ভিন্নভাবে আঁকা। অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডার কোনো অভিশাপ নয়, বরং এক ভিন্নতর জীবনবোধের নাম। নীল রঙের শান্ত আভার মতো এই শিশুরা শান্ত, গভীর এবং রহস্যময়।
বিজ্ঞানের চোখে অটিজম
অটিজম কোনো শারীরিক রোগ নয় যে ওষুধ খেলেই সেরে যাবে। এটি মূলত মস্তিষ্কের বিকাশজনিত একটি অবস্থা (Neurodevelopmental Disorder)। আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান বলছে, সাধারণ মানুষের মস্তিষ্ক যেভাবে বাইরের উদ্দীপনা—শব্দ, আলো কিংবা স্পর্শ—গ্রহণ করে, অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তির মস্তিষ্ক তা অনেক বেশি তীব্রভাবে অনুভব করে।
আমাদের কাছে যে শব্দ সাধারণ, তাদের কাছে তা হতে পারে কানের পর্দায় তীব্র আঘাত। আমাদের কাছে যে আলো স্বাভাবিক, তাদের কাছে তা চোখ ধাঁধানো বজ্রচমকের মতো। এই অতিসংবেদনশীলতার কারণেই তারা অনেক সময় অস্থির হয়ে পড়ে, যাকে আমরা ভুলবশত ‘জেদ’ বা ‘অস্বাভাবিকতা’ বলে থাকি।
অটিজমকে ‘স্পেকট্রাম’ বলা হয় কেন? কারণ এটি রংধনুর মতোই বৈচিত্র্যময়। এখানে যেমন মৃদু লক্ষণযুক্ত ব্যক্তি আছেন, তেমনি আছেন অতি-চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হওয়া মানুষও। কেউ হয়তো কথা বলতে পারেন না, অথচ তার তুলির আঁচড়ে ফুটে ওঠে অসাধারণ সব শিল্পকর্ম।
আবেগের দেয়াল বনাম হৃদয়ের টান
অনেকেই মনে করেন, অটিস্টিক শিশুদের কোনো আবেগ নেই। এটি একটি চরম ভুল ধারণা। তারা ভালোবাসতে জানে, কষ্ট পায়, এমনকি অন্যের কষ্টও অনুভব করতে পারে। সমস্যাটি কেবল প্রকাশভঙ্গিতে।
আমরা যেভাবে হাসিতে বা কথায় আবেগ প্রকাশ করি, তারা হয়তো তা পারে না। তাদের আবেগ প্রকাশিত হয় নীরবতায়, হাতের আঙুলের বিশেষ ভঙ্গিতে কিংবা প্রিয় কোনো খেলনার প্রতি গভীর মমতায়।
একজন অটিস্টিক শিশুর মা যখন সন্তানের চোখে চোখ রাখার (Eye Contact) জন্য মাসের পর মাস অপেক্ষা করেন, আর একদিন শিশুটি মুহূর্তের জন্য হলেও মায়ের চোখের দিকে তাকায়—সেই এক সেকেন্ডের চাহনি পৃথিবীর অনেক কাব্যগ্রন্থের চেয়েও বেশি আবেগ ধারণ করে।
অটিজম ও আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা
আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, এই শিশুরা কেন সমাজের মূলধারা থেকে পিছিয়ে পড়ে? কারণ আমাদের সমাজটি তৈরি হয়েছে তথাকথিত ‘স্বাভাবিক’ মানুষদের কেন্দ্র করে।
সহমর্মিতা, করুণা নয়
একজন অটিস্টিক শিশু যখন জনসমক্ষে চিৎকার করে, তখন আশপাশের মানুষের তির্যক দৃষ্টি তার মা-বাবার জন্য সবচেয়ে বড় যন্ত্রণার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের প্রয়োজন বিচার না করে পাশে দাঁড়ানো।
প্রতিভার সঠিক মূল্যায়ন
অটিজমে আক্রান্ত ব্যক্তিদের মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতা (Hyper-focus) অনেক সময় সাধারণের চেয়ে বেশি হয়। তারা তথ্যের সূক্ষ্ম বিন্যাস বুঝতে পারে। বিশ্বের বহু সফল প্রোগ্রামার, গবেষক ও গণিতবিদ এই স্পেকট্রামের অন্তর্ভুক্ত।
আলিঙ্গন করার মানসিকতা
সচেতনতা মানে কেবল অটিজম সম্পর্কে জানা নয়; সচেতনতা মানে তাদের জন্য আমাদের স্কুল, পার্ক ও কর্মক্ষেত্রের দরজা খুলে দেওয়া।
বৈচিত্র্যের মধ্যেই পূর্ণতা
একটি বাগান যেমন কেবল এক রকমের ফুল দিয়ে সুন্দর হয় না, তেমনি পৃথিবীটাও কেবল এক ধরনের মানুষের জন্য নয়। অটিজম আক্রান্ত প্রতিটি মানুষ আমাদের শেখায় ধৈর্য ধরতে, শেখায় শব্দ ছাড়াও হৃদয়ের ভাষা বুঝতে।
নীল রঙের বাতি জ্বালিয়ে আমরা কেবল সচেতনতার বার্তা ছড়িয়ে দিই না, বরং আমাদের হৃদয়ের দরজাগুলোও উন্মুক্ত করি। অটিজম কোনো সীমাবদ্ধতা নয়; এটি মানুষের অসীম বৈচিত্র্যের এক বিশেষ অধ্যায়।
আসুন, তাদের সীমাবদ্ধতাকে নয়, বরং তাদের ভিন্ন সক্ষমতাকে উদযাপন করি। কারণ ভালোবাসা কোনো শর্ত মানে না, আর মানুষের যোগ্যতা কোনো সংজ্ঞায় সীমাবদ্ধ থাকে না।

লেখক— রিফাত আরা রিফা
পরামর্শদাতা
এলাহা অটিজম ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন, ইউএসএ।
Development by: webnewsdesign.com