ঢাকা
০৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ
Advertise with us

অধিকার জানলেই জাগে দায়িত্ববোধ

বাংলাদেশ মিডিয়া ডেস্ক
রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬   ২৩৩ বার পঠিত
অধিকার জানলেই জাগে দায়িত্ববোধ

সমাজে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা কোনো একদিনে অর্জিত সাফল্য নয়; এটি গড়ে ওঠে দীর্ঘদিনের সচেতনতা, মূল্যবোধ ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিতের ওপর। আর এই ভিত্তির কেন্দ্রে থাকে একজন সচেতন নাগরিক। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, আমাদের সমাজের বড় একটি অংশ এখনো নিজেদের মৌলিক অধিকার সম্পর্কে পুরোপুরি অবগত নয়। এর ফলেই আমরা কখনো নিঃশব্দে বঞ্চনার শিকার হই, আবার কখনো অজান্তেই অন্যের অধিকার ক্ষুণ্ন করি। তাই অধিকার সম্পর্কে জানা কেবল ব্যক্তিগত প্রয়োজন নয়; এটি একটি সামাজিক দায়িত্ব, এমনকি নাগরিক চেতনার অন্যতম প্রধান শর্ত।

অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা একজন মানুষকে শুধু তথ্যসমৃদ্ধ করে না, তাকে আত্মবিশ্বাসী ও দৃঢ়চেতা করে তোলে। যে ব্যক্তি জানেন তার প্রাপ্য কী, তিনি অন্যায়ের কাছে মাথা নত করেন না। শিক্ষার অধিকার তাকে আলোকিত করে, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা তাকে নিজের ভাবনা তুলে ধরার সুযোগ দেয়, আর নিরাপত্তার অধিকার তাকে নিশ্চিত করে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার। এসব অধিকার সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকলে ব্যক্তি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যের অধিকার রক্ষার ক্ষেত্রেও ভূমিকা রাখতে সক্ষম হন। ফলে সমাজে একধরনের ন্যায়বোধ ও পারস্পরিক সম্মানবোধ গড়ে ওঠে।

তবে অধিকারবোধের এই জাগরণ একা আসে না; এর সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে থাকে দায়িত্ববোধ। প্রকৃতপক্ষে, অধিকার ও দায়িত্ব একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। আমরা যখন নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই, তখনই উপলব্ধি করি—আমাদের প্রতিটি কাজের প্রভাব অন্যদের ওপরও পড়ে। তাই নিজের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ব্যবহার করতে গিয়ে যদি অন্যের সম্মানহানি ঘটে, তবে তা আর প্রকৃত স্বাধীনতা থাকে না; বরং সেটি হয়ে ওঠে অপব্যবহার। একইভাবে, নিজের নিরাপত্তার কথা ভাবার পাশাপাশি অন্যের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও আমাদের নৈতিক ও সামাজিক দায়িত্বের অংশ।

বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই লক্ষ্য করি, অনেকেই নিজেদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার হলেও দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনীহা দেখান। এর ফলে সমাজে এক ধরনের ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়। কেউ কেউ স্বাধীনতার নামে সীমালঙ্ঘন করেন, আবার কেউ দায়িত্বের কথা বলতে গিয়ে নিজের অধিকার বিসর্জন দেন। এই দুই চরমপন্থাই সমাজের জন্য ক্ষতিকর। একটি সুস্থ ও স্থিতিশীল সমাজব্যবস্থার জন্য প্রয়োজন—অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সুষম সমন্বয়।

এক্ষেত্রে পরিবার প্রথম পাঠশালা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। ছোটবেলা থেকেই শিশুদের শেখাতে হবে—নিজের প্রাপ্য যেমন আছে, তেমনি অন্যের প্রাপ্যকেও সম্মান করতে হবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নাগরিক শিক্ষা, মানবাধিকার ও নৈতিকতার বিষয়গুলো আরও গুরুত্ব দিয়ে পাঠদান করা প্রয়োজন। পাশাপাশি গণমাধ্যমেরও রয়েছে বিশাল দায়িত্ব। তথ্যপ্রবাহের এই যুগে গণমাধ্যম যদি ইতিবাচক ও সচেতনতামূলক ভূমিকা পালন করে, তবে সমাজে দ্রুত পরিবর্তন আনা সম্ভব।

রাষ্ট্রের দিক থেকেও সচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ অপরিহার্য। আইনের শাসন নিশ্চিত করা, নাগরিক অধিকার সংরক্ষণ এবং দায়িত্ব পালনে উৎসাহিত করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। কারণ একটি রাষ্ট্র তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার নাগরিকরা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন এবং দায়িত্ব পালনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকে।

সবশেষে বলা যায়, অধিকার জানা মানে শুধু নিজের প্রাপ্য বুঝে নেওয়া নয়; বরং এটি একটি বৃহত্তর সামাজিক চেতনার সূচনা। এটি মানুষকে মানবিক করে, দায়িত্বশীল করে এবং সমাজকে এগিয়ে নিয়ে যায় ন্যায় ও সাম্যের পথে। তাই আসুন, আমরা প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে অধিকার সম্পর্কে সচেতন হই এবং সেই সঙ্গে দায়িত্ব পালনে অঙ্গীকারবদ্ধ হই। কারণ সচেতন, দায়িত্বশীল নাগরিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি সুন্দর, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক সমাজ গড়ে তুলতে। আর সেই যাত্রার সূচনা হোক—নিজের অধিকার জানার মধ্য দিয়েই।

 

লেখক :
রিফাত আরা রিফা
(সমাজ উন্নয়নে অবদান রাখায়
সিলেট বিভাগের শ্রেষ্ঠ অদম্য নারী ২০২৫ এওয়ার্ড প্রাপ্ত)

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us