
‘সবার আগে বাংলাদেশ, সবার জন্য বাংলাদেশ’—এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৃহস্পতিবার নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় দেওয়া প্রথম ভাষণে তিনি এ কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, তরুণরা যাতে নিজেদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ পায়, নারীরা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে জীবন পরিচালনা করতে পারে এবং প্রতিটি শিশু তার সম্ভাবনা বিকাশের সুযোগ পায়—এমন একটি নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ বাংলাদেশ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য।
তিনি বলেন, জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করে একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর ও কল্যাণমুখী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় বাংলাদেশ। দল-মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের সমান অধিকার, সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই রাষ্ট্রের লক্ষ্য।
গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার ভিত্তিতে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে।
তরুণদের কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে একটি ‘ম্যানুফ্যাকচারিং হাব’ হিসেবে গড়ে তুলতে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। স্টার্টআপ উদ্যোগে সহায়তার জন্য চলতি অর্থবছরে ৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা তৈরিকে সরকারের পরিকল্পনার অগ্রভাগে রাখা হয়েছে। অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া মানুষের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, ফার্মার্স কার্ড, স্পোর্টস কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এসব কার্ড সমন্বিত করে ‘ইউনিভার্সাল কার্ড’ চালুর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
শিক্ষা ও দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, শিক্ষাখাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে এবং আগামী পাঁচ বছরে পর্যায়ক্রমে এ খাতে জিডিপির বরাদ্দ ৫ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে। কারিগরি ও ব্যবহারিক শিক্ষার পাশাপাশি খেলাধুলাকেও গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানান তিনি।
ভাষণে বৈশ্বিক প্রযুক্তিগত বৈষম্য দূর করার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করলেও প্রযুক্তির সুযোগ এখনো সবার জন্য সমান নয়। আজকের ডিজিটাল বিভাজন যেন আগামী দিনের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিভাজনে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী সুনিশ্চিত অর্থায়ন, বাজারে প্রবেশাধিকার, প্রযুক্তি হস্তান্তর ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়তা চান।
বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের সংঘাত ও মানবিক সংকটের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংঘাতের সমাধান হতে হবে আলোচনা, কূটনীতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠাসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য অধিকারের প্রতি বাংলাদেশের সমর্থনও পুনর্ব্যক্ত করেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ৯ বছরেরও বেশি সময় ধরে মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে উল্লেখ করে তিনি তাদের নিরাপদে মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনকে সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে তুলে ধরেন।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী জলবায়ু ন্যায়বিচার, অর্থায়ন ও অভিযোজন সহায়তায় আরও কার্যকর বৈশ্বিক পদক্ষেপের দাবি জানান। আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি গাছ লাগানো এবং বন্যা ও খরা মোকাবিলায় সারাদেশে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল খননের কর্মসূচির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদানের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শান্তিরক্ষীরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মানবতার সেবায় নিয়োজিত রয়েছেন।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের প্রতিপাদ্য—‘রিস্টোরিং ট্রাস্ট, ম্যানেজিং ট্রান্সফরমেশন: অ্যা ইউনাইটেড নেশনস দ্যাট ডেলিভারস ফর অল’—উল্লেখ করে বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।