বৈশ্বিক শ্রমবাজারে বাংলাদেশের কর্মীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং নতুন নতুন দেশে শ্রমবাজার সম্প্রসারণে বড় ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। আগামী পাঁচ বছরে এক কোটি দক্ষ কর্মী বিদেশে পাঠানোর পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে তরুণ-তরুণীদের কারিগরি শিক্ষা, ভাষা ও পেশাগত প্রশিক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী করে গড়ে তোলার উদ্যোগ চলছে।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানিয়েছেন, সরকারের বৈশ্বিক কর্মসংস্থান কৌশলের অন্যতম লক্ষ্য হলো প্রচলিত শ্রমবাজারের বাইরে নতুন ও সম্ভাবনাময় দেশগুলোতে দক্ষ কর্মী পাঠানো। এ ক্ষেত্রে বিকল্প ও উদীয়মান শ্রমবাজার সম্প্রসারণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সরকারের এই পরিকল্পনার প্রধান লক্ষ্যগুলোর মধ্যে রয়েছে নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টি, রেমিট্যান্স বাড়ানো, নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিত করা, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য বন্ধ এবং বিদেশে কর্মীদের অধিকার ও আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করা।
দক্ষ জনশক্তি তৈরির লক্ষ্যে সারাদেশে ১০৪টি কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) মাধ্যমে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদা বিবেচনায় তথ্যপ্রযুক্তি, আধুনিক ড্রাইভিং, নার্সিং, কেয়ারগিভিং, ইলেকট্রিক্যাল, মেকানিক্যাল ও হসপিটালিটিসহ ৫৫টি কারিগরি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে।
পাশাপাশি ইংরেজির পাশাপাশি জাপানি, কোরীয়, জার্মান ও আরবি ভাষায় বিশেষায়িত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। কর্মীদের দক্ষতার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিশ্চিত করতে বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ সনদ প্রদান এবং আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে।
প্রচলিত মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য অঞ্চলে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে কাজ করছে সরকার। ইতালি, জার্মানি, গ্রিস, রোমানিয়া, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াকে এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাময় গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালুর বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। নতুন ব্যবস্থায় ৩৩৮টি অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে কর্মী নিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশের বিশেষ অনুরোধে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে ১০ হাজার কর্মী নিয়োগে নীতিগত সম্মতি দিয়েছে মালয়েশিয়া। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তত্ত্বাবধানে এ কর্মসূচি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
জাপানের সঙ্গে নির্দিষ্ট দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী (এসএসডব্লিউ) নিয়োগের ব্যবস্থাও কার্যকর রয়েছে। এর আওতায় জাপানি ভাষায় দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় কারিগরি সনদধারী বাংলাদেশিরা বয়স্কদের সেবাযত্ন, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, কৃষি ও আতিথেয়তা খাতে কাজের সুযোগ পাচ্ছেন।
ইউরোপের শ্রমবাজারে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীদের প্রবেশাধিকার বাড়াতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) যৌথভাবে ‘সাপোর্টিং আ ট্যালেন্ট পার্টনারশিপ উইথ বাংলাদেশ’ শীর্ষক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।
এই উদ্যোগের মাধ্যমে ইউরোপের শ্রমিক সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ থেকে দক্ষ তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, প্রকৌশলী ও কারিগরি কর্মী পাঠানোর সুযোগ তৈরির লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে বোয়েসেল ও জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি) সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
এ ছাড়া ইতালির অর্থায়নে বাংলাদেশে বিনা খরচে প্রাক্-প্রস্থান প্রশিক্ষণ, ভাষা শিক্ষা ও ওরিয়েন্টেশন কর্মসূচি চালু হয়েছে। যুক্তরাজ্যের স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক সেবা খাতেও অনুমোদিত স্পনসরশিপ ব্যবস্থার আওতায় বাংলাদেশি নার্স ও কেয়ারগিভারদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে।
জার্মানির ‘অপরচুনিটি কার্ড’ ব্যবস্থার মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী ও প্রকৌশলীদের চাকরি খোঁজার সুযোগ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি রোমানিয়া, গ্রিস, সার্বিয়া, পর্তুগাল, ক্রোয়েশিয়া ও হাঙ্গেরিতে কৃষি, সরবরাহব্যবস্থা, নির্মাণ ও আতিথেয়তা খাতে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা রয়েছে।
ইউরোপের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের কৃষি, নির্মাণ এবং গাড়ি মেরামত খাতে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণে আগ্রহী সরকার। এ ছাড়া রাশিয়া ও ইউরেশিয়ার উৎপাদনশিল্প এবং মালদ্বীপ ও সেশেলসের পর্যটন, আবাসন ও নির্মাণ খাতেও বাংলাদেশি কর্মীদের কাজের সুযোগ রয়েছে।
দক্ষ কর্মী পাঠানোর পাশাপাশি অভিবাসন ব্যয় কমানো এবং বিদেশে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। এ লক্ষ্যে বৈধ নিয়োগপ্রক্রিয়া, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম এবং সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কর্মী পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া অননুমোদিত মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বন্ধ, অতিরিক্ত অভিবাসন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং অনিয়মিত অভিবাসন প্রতিরোধে আইনি ব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রবাসীদের জন্য ডিজিটাল মাইগ্র্যান্ট কার্ডের মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধা, বিমা সুরক্ষা ও জরুরি আইনি সহায়তা নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ১ জুলাই থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ১০ দশমিক ৭২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আগের অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় এ প্রবাহ ১১ দশমিক ৯ শতাংশ বেশি। সদ্যসমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে দেশে রেকর্ড ৩৫ দশমিক ৫৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স এসেছে।
সরকারের প্রত্যাশা, অদক্ষ শ্রমিকের পরিবর্তে চাহিদাভিত্তিক কারিগরি দক্ষতাসম্পন্ন কর্মী বিদেশে পাঠানো সম্ভব হলে রেমিট্যান্স প্রবাহ আরও বাড়বে। একই সঙ্গে কর্মীদের আয়, কর্মপরিবেশ ও পেশাগত মর্যাদার উন্নতি ঘটবে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দক্ষ জনশক্তি তৈরি ও বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণ করা গেলে বেকারত্ব হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা আয় বৃদ্ধি এবং দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা জোরদারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।


মন্তব্য করুন