​চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে চাঞ্চল্যকর যুবদলকর্মী তারেক হোসেন বাপ্পি হত্যাকাণ্ড এবং অপর এক তরুণকে গুরুতর জখম করার ঘটনায় ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। এলাকাজুড়ে আধিপত্য বিস্তার ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়াই কাল হয়েছিল বাপ্পির জন্য। পূর্বপরিকল্পিতভাবে ওত পেতে থেকে তাঁকে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। এই ঘটনায় মূল আসামিসহ মোট ৬ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এ সময় তাঁদের কাছ থেকে একটি এলজি, একটি রিভলভার ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয়।

​রবিবার (১৮ অক্টোবর) সকাল ১১টায় নাসিরাবাদস্থ চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ সুপার কার্যালয়ে আয়োজিত এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানান পুলিশ সুপার মো. মাসুদ আলম।

​পুলিশের দেওয়া তথ্য ও মামলার বিবরণী অনুযায়ী, গত ১৬ অক্টোবর (শুক্রবার) রাত পৌনে ১১টার দিকে সীতাকুণ্ডের বাড়বকুণ্ড ইউনিয়নের অলিনগর তিন রাস্তার মোড়সংলগ্ন পাকা রাস্তায় এই হামলার ঘটনা ঘটে। রাতের খাবার শেষে বন্ধু ইমনকে সঙ্গে নিয়ে মোটরসাইকেলে করে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন তারেক হোসেন বাপ্পি।

​পূর্ব থেকেই আগ্নেয়াস্ত্র ও দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ওৎ পেতে থাকা একদল সন্ত্রাসী তাদের পথরোধ করে। মুহূর্তেই বাপ্পি ও ইমনকে মোটরসাইকেল থেকে নামিয়ে শুরু হয় বেধড়ক মারধর। একপর্যায়ে মূল অভিযুক্ত মো. আরিফ হোসেন সরাসরি বাপ্পিকে লক্ষ্য করে অস্ত্র তাক করেন এবং অন্য সহযোগীরা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে শুরু করেন। বাপ্পির সঙ্গে থাকা ইমন কৌশলে পালিয়ে জীবন রক্ষা করতে সক্ষম হলেও ঘাতকরা বাপ্পির বুকে পরপর গুলি চালায়।

​গুলির শব্দ শুনে স্থানীয় তাপসির আলম শাওন বাপ্পিকে উদ্ধারের জন্য এগিয়ে এলে তাঁকেও লক্ষ্য করে গুলি ছোড়া হয় এবং ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করা হয়। দুই তরুণ রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে লুটিয়ে পড়ার পর সন্ত্রাসীরা ফাঁকা গুলি ছুড়ে এলাকায় আতঙ্ক তৈরি করে পালিয়ে যায়।

​যে বিরোধের জেরে এই রক্তপাত ​প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহত তারেক হোসেন বাপ্পির সঙ্গে প্রধান অভিযুক্ত মো. আরিফ হোসেন ও তার সহযোগীদের দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে দ্বন্দ্ব চলছিল। এলাকার বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার জন্য বাপ্পি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা অভিযুক্তদের একাধিকবার মৌখিকভাবে ও সামাজিকভাবে সতর্ক করেছিলেন।

​স্থানীয় আধিপত্য বিস্তারের পথে বাপ্পিকে নিজেদের প্রধান বাধা মনে করে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে সন্ত্রাসীরা। এরই জের ধরে প্রতিশোধ নিতে তারা এই জঘন্য হত্যাকাণ্ডের ছক কষে এবং সুযোগ বুঝে হামলা চালায়।

​হত্যাকাণ্ডের পরপরই নড়েচড়ে বসে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশ। অপরাধীদের দ্রুত শনাক্ত ও আইনের আওতায় আনতে মাঠে নামে একাধিক টিম। ঘটনাস্থলের ডিজিটাল তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বিবরণ এবং ধারাবাহিক সাঁড়াশি অভিযান চালিয়ে মাত্র ২৪ ঘণ্টার ব্যবধানে মামলার মূলহোতাসহ ৬ জনকে গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয় পুলিশ।

​গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা হলেন: ১. মো. আরিফ হোসেন (২৯), পিতা- ইসমাইল হোসেন ওরফে বিকষু, সাকিন: বাড়বকুণ্ড মধ্যম মাহমুদাবাদ দিঘীর নামা (ফকির আহম্মদের নতুন বাড়ি)। ২. ফখরুল ইসলাম (৩২), পিতা- মৃত নুর আলম, সাকিন: অলিনগর চৌকিদার বাড়ি। ৩. আব্দুল মান্নান (২৮), পিতা- আবুল কাশেম, সাকিন: নডালিয়া। ৪. মো. ইফতেখার (৩৫), পিতা- মোজাম্মেল হক, সাকিন: অলিনগর নতুন বদু বাড়ি। ৫. আরিফুল ইসলাম জাবেদ (২৫), পিতা- মো. নজরুল ইসলাম, সাকিন: মুরাদপুর হাসনাবাদ (জিয়াজি হুজুরের বাড়ি)। ৬. নুর আহাম্মদ রনি, পিতা- মৃত জহির ইসলাম, সাকিন: বাড়বকুণ্ড মধ্যম মাহমুদাবাদ দীঘির নামা।

​পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে এবং অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পৃথক মামলা দায়েরের প্রস্তুতি রয়েছে। নৃশংস এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত বাকিদের গ্রেপ্তারেও অভিযান অব্যাহত রয়েছে।