
বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার কার্যালয়, আবগারি ও ভ্যাট বিভাগ, সিলেটে কর্মরত বেশ কয়েকজন কর্মকর্তার ঘুষ-বাণিজ্য ও দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত বিপুল পরিমাণ অর্থ-সম্পদের সন্ধান মিলেছে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার অনুসন্ধানে। কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট, সিলেটের অধীন এ কার্যালয়ের কর্মকর্তারা সিলেট মহানগরীর বিভিন্ন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে মাঝে মধ্যে পরিচালনা করেন ‘শুদ্ধ’ ও ‘অশুদ্ধ’ অভিযান।
‘শুদ্ধ’ অভিযানের অর্থ হলো—সরকারের রাজস্ব আদায়ে কৌশল ও যুক্তিসঙ্গত চাপ প্রয়োগের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে সঠিকভাবে ভ্যাট প্রদানে উৎসাহিত করা। আর ‘অশুদ্ধ’ অভিযানের অভিযোগ হলো—ব্যক্তিগত ঘুষের টাকার পরিমাণ বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানকে কৌশলে ভয়ভীতি দেখানো ও হয়রানিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিজেদের পকেট ভারী করা। যে পরিস্থিতি ব্যবসায়ীদের জন্য ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’-এর মতো।
সিলেটে কিছু ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেগুলো ব্যাংকঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছে। প্রতি মাসে ব্যাংকের কিস্তি পরিশোধের পাশাপাশি কারখানা ভাড়া, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতনসহ অন্যান্য ব্যয় মেটাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের মালিকদের। এর মধ্যে কেউ কেউ সীমিত লাভে ব্যবসা চালিয়ে গেলেও অনেকেই ইতোমধ্যে ঋণখেলাপিতে পরিণত হয়েছেন।
অভিযোগ রয়েছে, এর মধ্যেও সংশ্লিষ্ট দুই কাস্টমস কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে দাবি করছেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। ঘুষ না দিলে কারখানা বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি কিংবা শুল্ক আইনে অন্যায়ভাবে মামলা দেওয়ার ভয় দেখানো হয়—এমন অভিযোগও উঠেছে। ফলে ব্যাংকের ঋণের কিস্তি, কারখানা ভাড়া ও কর্মচারীদের বেতন পরিশোধের চাপের পাশাপাশি কথিত ঘুষের বোঝাও বহন করতে হচ্ছে ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প উদ্যোক্তাদের।
জানা যায়, সিলেট নগরীর গোটাটিকর এলাকায় ‘মুনমুন কেমিক্যাল কোম্পানি’ নামে একটি প্রতিষ্ঠান ছিল। প্রতিষ্ঠানটির প্রোপাইটর ছিলেন দিলীপ দেবনাথ। অভিযোগ রয়েছে, কাস্টমস কর্মকর্তাদের কথিত ঘুষের চাপ সহ্য করতে না পেরে একপর্যায়ে কারখানাটি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হন তিনি।
মুনমুন কেমিক্যালের প্রোপাইটর দিলীপ দেবনাথ প্রতি মাসে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করতেন। তবে ঘুষের কথিত চাপ বাড়তে থাকায় শেষ পর্যন্ত ২০২৪ সালের ১০ মে কারখানাটি বন্ধ ঘোষণা করতে বাধ্য হন তিনি।
দিলীপ দেবনাথ বলেন, ‘সরকারকে ভ্যাট দেব, আবার ঘুষও দেব—এমনটা হতে পারে না। কারখানা বন্ধের আগে এসব বিষয়ে বিভাগীয় কাস্টমস ও ভ্যাট কমিশনারের সঙ্গে দেখা করতে তিন দিন অফিসে গিয়েও অনুমতি পাইনি। একজন নিয়মিত ভ্যাট প্রদানকারী ব্যবসায়ী কেন তাঁর সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাবেন না? এ রাগ ও ক্ষোভ থেকেই শেষ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ করে দিই।’
এসব বিষয়ে বিস্তর অভিযোগ এবং কয়েকটি সূত্রের মাধ্যমে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া। অনুসন্ধানে উঠে আসে বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার কার্যালয়, আবগারি ও ভ্যাট বিভাগ, সিলেটে কর্মরত সার্কেল-১-এর ভ্যাট কর্মকর্তা আরও মো. রেজওয়ান কবিরের নাম।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রেজওয়ান কবিরের জন্মস্থান রংপুর বিভাগের দিনাজপুর জেলার ঘোড়াঘাট উপজেলার চেচুড়িয়া গ্রামে। তবে পরিবার নিয়ে তিনি বসবাস করেন ঢাকার অভিজাত এলাকা গুলশানে। অভিযোগ রয়েছে, নিজের নামে সেখানে একটি বহুতল ভবনও নির্মাণ করেছেন তিনি। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি চাকরিতে থাকা একজন কর্মকর্তার নামে এত বিপুল সম্পদের উৎস কী?
শুধু তাই নয়, অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, শ্বশুরবাড়ির লোকজনের নামেও বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি গড়ে তোলার অভিযোগ রয়েছে রেজওয়ান কবিরের বিরুদ্ধে। এসব সম্পদের প্রকৃত উৎস কী এবং সরকারি চাকরির আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের সামঞ্জস্য রয়েছে কি না—তা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।
প্রতি সপ্তাহের ছুটিতে ঢাকায় অবস্থানরত পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে সিলেট থেকে নিয়মিত বিমানে যাতায়াত করেন রেজওয়ান কবির। মাসে গড়ে চারবার বিমানে যাতায়াত করতেই তাঁর খরচ হয় আনুমানিক ৫০ হাজার টাকা। প্রশ্ন উঠছে, ৯ম গ্রেডের একজন সরকারি কর্মকর্তার বেতন থেকে নিয়মিত এই বিপুল যাতায়াত ব্যয় বহন করা এবং একই সঙ্গে এমন বিলাসবহুল জীবনযাপন করা কতটা সম্ভব? সপ্তাহের শেষ কর্মদিবসের পরে রাতে সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বিজি-৬০২ ঢাকাগামী ফ্লাইটে আরও রেজওয়ান কবিরের পিছু নেয় অনুসন্ধানী টিমের একজন সদস্য। সর্বশেষ তার গন্তব্য গুলশানের বাসা পর্যন্ত নিশ্চিত করা হয়।
আরাফাত প্লাস্টিক স্টোরে প্লাস্টিকের বোতল তৈরির জন্য পিপিম দিয়ে বোতল ফোলানোর কাজ করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রোপাইটর ইসমাইল হোসেন জানান, ২০২৬ সালের জুন মাসে তাঁর কারখানার ভ্যাট ছিল ২০ হাজার টাকা। কিন্তু পরবর্তী মাস জুলাইয়ে হঠাৎ করে ভ্যাটের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয় ১ লাখ টাকা। এতে তিনি আর্থিকভাবে চাপে পড়েন।
শুধু তাই নয়, কাস্টমস কর্মকর্তারা তাঁর প্রতিষ্ঠানে গিয়ে অসদাচরণ করেন বলেও অভিযোগ করেন ইসমাইল হোসেন। তাঁর ভাষ্য, কর্মকর্তাদের আচরণ ছিল এমন, যা তাঁর পক্ষে সহ্য করা কঠিন হয়ে পড়ে। পরে ওই দিনের ভ্যাট কর্মকর্তারা তাঁকে অফিসে যেতে বলেন।
ইসমাইল হোসেন বলেন, অফিসে যাওয়ার পর ভ্যাট সার্কেল-১-এর এআরও কাউসার তাঁকে বলেন, ‘প্রতি মাসে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা আমাকে দিতে হবে। তাহলে শান্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন। তা না হলে কারণে-অকারণে আপনাকে ডিস্টার্ব করা হবে।’
ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেনের দাবি, গত জুন মাসের ৭ তারিখ থেকে টানা ২১ দিন ভ্যাট ও কাস্টমস অফিসে গিয়ে সমস্যার সমাধানের আশায় সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছেন তিনি। তবে এতে কোনো সমাধান হয়নি বলে অভিযোগ তাঁর।
ইসমাইল হোসেনের ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যাট সার্কেল-১-এর এআরও কাউসারের প্রস্তাব ছিল—ব্যাংকের মাধ্যমে ভ্যাট বাবদ ৪০ হাজার টাকা জমা দেওয়ার পাশাপাশি তাঁকে অতিরিক্ত ৫০ হাজার টাকা দিতে হবে। অর্থাৎ মোট ৯০ হাজার টাকা দিলেই তিনি শান্তিতে ব্যবসা করতে পারবেন। অন্যথায় কারণে-অকারণে হয়রানির শিকার হতে হবে বলে তাঁকে জানানো হয়।
দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়াকে ব্যবসায়ী ইসমাইল হোসেন জানান, এআরও কাউসারের ওই অনৈতিক প্রস্তাবে তিনি রাজি হননি। এর পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে টানা ২১ দিন ভ্যাট ও কাস্টমস অফিসে আসতে বাধ্য করা হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
ইসমাইল হোসেন বলেন, সর্বশেষ এআরও কাউসার তাঁর প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট বাবদ ব্যাংকের মাধ্যমে ট্রেজারি চালানে ১ লাখ টাকা জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। পরে তিনি ব্যাংকের মাধ্যমে ১ লাখ টাকা ভ্যাট পরিশোধ করেন।
তিনি আরও বলেন, ‘টানা ২১ দিন অফিসে আসা-যাওয়া করানো একপ্রকার আমাকে শাস্তি দেওয়ার মতো। আমার প্রতিষ্ঠান এত বড় নয় যে প্রতি মাসে ১ লাখ টাকা ভ্যাট দিতে হবে। আমি বাসার পাশে ছোট পরিসরে কারখানাটি পরিচালনা করি। এভাবে ভ্যাটের চাপ বাড়তে থাকলে কারখানা বন্ধ করে দিতে হবে। তখন আমি ছাড়াও আরও চারজন শ্রমিক বেকার হয়ে পড়বেন।’
দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার টানা তিন মাসের অনুসন্ধানে জানা যায়, এআরও মো. কাউসার মৃধার বাড়ি বরিশাল বিভাগের পটুয়াখালী জেলার সদর উপজেলার মৌকরন এলাকায়। তবে ঢাকার মিরপুর-২, কাফরুল থানাধীন পশ্চিম বাইশটেকী এলাকায় রয়েছে তাঁর কয়েকটি ফ্লাট। প্রশ্ন উঠেছে, এসব ফ্লাট ক্রয়ের অর্থের উৎস কী? একজন ১০ম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তার সেই আয়ের উৎস জানতে অনুসন্ধানী টিম আরও গভীরে অনুসন্ধান চালায়।
এআরও কাউসার মৃধার ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই—অর্থাৎ টানা চার মাসের কথিত অতিরিক্ত আয়ের উৎসের রহস্য খুঁজতে গিয়ে বেশ কিছু তথ্য উঠে আসে অনুসন্ধানী টিমের হাতে। অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথমে ঘুষের পরিমাণ নির্ধারণ করে প্রস্তাব পাঠান বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার কার্যালয়, আবগারি ও ভ্যাট বিভাগ, সিলেটে কর্মরত সার্কেল-১-এর ভ্যাট কর্মকর্তা আরও মো. রেজওয়ান কবির। পরে সেই প্রস্তাব এআরও কাউসার মৃধার কাছে পৌঁছালে তিনি সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ঘুষের দরদাম নিয়ে আলোচনা করেন।
দরদাম চূড়ান্ত হওয়ার পর নির্ধারিত টাকা এআরও কাউসার মৃধা ব্যবসায়ীদের নিকট হতে সরাসরি না নিয়ে অফিস সহায়ক রাজুর হাতে তুলে দেওয়া হয় বলে অনুসন্ধানে তথ্য পাওয়া গেছে। অভিযোগ রয়েছে, এভাবেই বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কথিত ঘুষের টাকা সংগ্রহ করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার কার্যালয়, আবগারি ও ভ্যাট বিভাগ, সিলেটে কর্মরত এক কর্মকর্তা দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়াকে জানান, অফিস সহায়ক রাজু এআরও ও ভ্যাট কর্মকর্তাদের ‘কালেকশন ম্যান’ হিসেবে কাজ করছেন। তাঁর মাধ্যমে বিভিন্ন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে কথিত ঘুষের টাকা সংগ্রহ করা হয় বলে অভিযোগ ওই কর্মকর্তার।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, গত ১২ জুলাই ২০২৬ সকাল আনুমানিক ৭টার দিকে ভারতীয় শাড়ির একটি চোরাচালানের গাড়ি আটক করা হয়। পরে আরও মো. রেজওয়ান কবির ও এআরও কাউসার মৃধা ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি রফাদফা করে গাড়িটি ছেড়ে দেন বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এ ধরনের আরও কয়েকটি ঘটনায় বিভিন্ন সময়ে চোরাচালানের পণ্যসহ গাড়ি আটকের পর কথিত ঘুষের বিনিময়ে রফাদফা করে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে আরও মো. রেজওয়ান কবির ও এআরও কাউসার মৃধার বিরুদ্ধে।
বিভাগীয় ভ্যাট কর্মকর্তার কার্যালয়, আবগারি ও ভ্যাট বিভাগ, সিলেটে কর্মরত আরও মো. রেজওয়ান কবির ও এআরও কাউসার মৃধার বিরুদ্ধে ওঠা এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করে দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়ার অনুসন্ধানী টিম। তবে তাঁরা কেউই ফোন রিসিভ করেননি। পরে সরাসরি তাঁদের বক্তব্য নিতে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে গেলেও দুজনকেই অফিসে পাওয়া যায়নি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও তাঁদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত ফিরে আসতে হয় অনুসন্ধানী টিমকে।
