
প্রকৃতির আকস্মিক রুদ্ররূপের মধ্যে শিলাবৃষ্টি অন্যতম। অল্প সময়ের এই প্রাকৃতিক ঘটনা কখনো কখনো ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। গাড়ির কাচ ভাঙা থেকে শুরু করে কৃষকের ফসল নষ্ট—শিলাবৃষ্টির ক্ষতিকর প্রভাব অনেক ক্ষেত্রেই ভয়াবহ। সম্প্রতি দুটি বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উঠে এসেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ভবিষ্যতে শিলাবৃষ্টির ধরন আরও পরিবর্তিত হতে পারে এবং বড় আকারের শিলার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির ফলে শিলাবৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ ধীরে ধীরে মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যাচ্ছে। একই সঙ্গে শিলাবৃষ্টির সময়কালেও পরিবর্তন আসছে। গ্রীষ্মের পরিবর্তে শীতকালেও এর প্রবণতা বাড়তে পারে।
গবেষকদের একটি দল জানিয়েছে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে উত্তর ইউরোপ, কানাডা, দক্ষিণ-পূর্ব অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের মতো অঞ্চলে ভবিষ্যতে শিলাবৃষ্টির প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনের পিকিং ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞানীদের আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, ভবিষ্যতে শিলাবৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। গবেষণায় বাংলাদেশের শিলাবৃষ্টির ধরনেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
যেভাবে তৈরি হয় শিলা
শিলাবৃষ্টি সাধারণত শক্তিশালী বজ্রঝড়ের মাধ্যমে সৃষ্টি হয়। এ সময় উষ্ণ ও আর্দ্র বাতাস দ্রুত ওপরে উঠে যায় এবং জলীয়বাষ্প বহন করে মেঘ তৈরি করে। মেঘের ভেতরে থাকা জলকণা অতিরিক্ত ঠান্ডায় বরফকণায় পরিণত হয়।
শক্তিশালী ঊর্ধ্বমুখী বায়ুপ্রবাহ যতক্ষণ এসব বরফকণাকে আকাশে ধরে রাখতে পারে, ততক্ষণ এগুলো বড় হতে থাকে। পরে ভারী হয়ে গেলে তা শিলা হিসেবে মাটিতে পড়ে।
ভবিষ্যতে কমবে সংখ্যা, বাড়বে আকার
বিজ্ঞানীরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বায়ুমণ্ডলে তাপমাত্রা ও জলীয়বাষ্পের পরিমাণ বাড়ছে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা শক্তিশালী ঝড় তৈরিতে সহায়তা করে, যা বড় আকারের শিলা তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে।
তবে উষ্ণ বায়ুমণ্ডলের কারণে ছোট আকারের শিলা মাটিতে পৌঁছানোর আগেই গলে যেতে পারে। ফলে ভবিষ্যতে শিলাবৃষ্টির সংখ্যা সামগ্রিকভাবে কমলেও, যখন শিলাবৃষ্টি হবে তখন শিলার আকার তুলনামূলকভাবে বড় হতে পারে।
অঞ্চলভেদে পরিবর্তনের আশঙ্কা
গবেষণায় আটটি জলবায়ু মডেলের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা ২ থেকে ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস বাড়লে শিলাবৃষ্টির প্রবণতা মধ্য অক্ষাংশ থেকে মেরু অঞ্চলের দিকে সরে যেতে পারে।
এর ফলে উত্তর ইউরোপ, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং নিউজিল্যান্ডে শিলাবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়তে পারে। অন্যদিকে উত্তর অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকার বড় অংশ, দক্ষিণ ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব চীনে এর প্রবণতা কমে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা, কৃষি পরিকল্পনা এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। কারণ ভবিষ্যতের শিলাবৃষ্টি কম ঘনঘন হলেও এর আঘাত হতে পারে আরও ভয়াবহ।