
আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত, একবার রাসুলুল্লাহ (সা.) একটি চাটাইয়ের ওপর বিশ্রাম নেন। ঘুম থেকে ওঠার পর তাঁর শরীরে চাটাইয়ের দাগ দেখা যায়। সাহাবিরা আরামদায়ক বিছানার ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দিলে তিনি বলেন, “দুনিয়ার সঙ্গে আমার কী সম্পর্ক? দুনিয়াতে আমি সেই পথিকের মতো, যে গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে আবার যাত্রা শুরু করে।” (জামে তিরমিজি, হাদিস : ২৩৭৭)
এই হাদিস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, দুনিয়ার জীবন সাময়িক, আর আখিরাতই মানুষের প্রকৃত ও চিরস্থায়ী আবাস। তাই একজন মুমিনের উচিত দুনিয়ার মোহে হারিয়ে না গিয়ে আখিরাতের প্রস্তুতিকে জীবনের প্রধান লক্ষ্য বানানো।
রাসুলুল্লাহ (সা.) চাইলেই বিলাসবহুল জীবনযাপন করতে পারতেন। কিন্তু তিনি সাদাসিধে জীবন বেছে নিয়েছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, প্রয়োজনীয় জিনিস গ্রহণ করা বৈধ হলেও ভোগ-বিলাসকে জীবনের লক্ষ্য বানানো উচিত নয়।
একজন মুমিন নিজেকে পৃথিবীর স্থায়ী বাসিন্দা নয়, বরং একজন মুসাফির হিসেবে বিবেচনা করবে। সে চিন্তা করবে—আমি কোথা থেকে এসেছি, কোথায় ফিরে যাব এবং সেই যাত্রার জন্য কী প্রস্তুতি নিয়েছি?
মৃত্যুর সঙ্গে মানুষের আমলের খাতা বন্ধ হয়ে যায়। তবে কিছু নেক আমল রয়েছে, যার সওয়াব মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। ইসলামে এগুলোকে সদকায়ে জারিয়া বলা হয়।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “মানুষ যখন মারা যায়, তখন তার সব আমল বন্ধ হয়ে যায়; তবে তিনটি আমল বন্ধ হয় না—সদকায়ে জারিয়া, উপকারী জ্ঞান এবং নেক সন্তান, যে তার জন্য দোয়া করে।” (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ১৬৩১)
১. মসজিদ নির্মাণে সহযোগিতা
মসজিদ নির্মাণ বা সম্প্রসারণে অংশগ্রহণ সদকায়ে জারিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মাধ্যম।
২. বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা
নলকূপ, কূপ বা পানির ট্যাংক স্থাপন করে মানুষের তৃষ্ণা নিবারণের ব্যবস্থা করা দীর্ঘস্থায়ী সওয়াবের উৎস।
৩. কোরআন ও দ্বীনি জ্ঞান প্রচার
কোরআন, হাদিস ও ইসলামী বই বিতরণ কিংবা দ্বীনি শিক্ষা প্রসারে সহায়তা করা অত্যন্ত ফজিলতপূর্ণ কাজ।
৪. বৃক্ষরোপণ করা
মানুষ, পাখি বা প্রাণী গাছ থেকে উপকৃত হলে তার সওয়াব রোপণকারীর আমলনামায় যুক্ত হতে থাকে।
৫. শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা বা সহযোগিতা
মাদ্রাসা, স্কুল বা শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনায় সহযোগিতা দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের মাধ্যম।
৬. চিকিৎসাসেবায় অবদান রাখা
হাসপাতাল, অ্যাম্বুলেন্স, চিকিৎসা সরঞ্জাম বা দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা সহায়তা সদকায়ে জারিয়ার অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
৭. কবরস্থানের জন্য জমি দান
মুসলমানদের দাফনের জন্য জমি ওয়াকফ বা দান করা একটি গুরুত্বপূর্ণ জনকল্যাণমূলক কাজ।
৮. রাস্তা, সেতু ও মুসাফিরখানা নির্মাণ
জনসাধারণের চলাচল ও সেবার জন্য অবকাঠামো নির্মাণ মানুষের উপকারে আসে এবং সওয়াবের ধারাও অব্যাহত রাখে।
৯. খাল, পুকুর বা জলাধার খনন
কৃষি, পরিবেশ ও মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটাতে এসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনে।
১০. জীবন রক্ষাকারী মানবসেবা
রক্তদান, চিকিৎসা প্রকল্প বা জীবন রক্ষাকারী স্থায়ী সেবামূলক কার্যক্রম মানবতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অবদান।
দুনিয়ার জীবন অস্থায়ী, কিন্তু নেক আমলের প্রভাব অনেক সময় মৃত্যুর পরও অব্যাহত থাকে। তাই আমাদের উচিত নিজের জন্য, বাবা-মা ও প্রিয়জনদের নামে এমন কিছু কল্যাণমূলক কাজ করে যাওয়া, যা কবরের জীবনেও নূর ও সওয়াবের কারণ হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সদকায়ে জারিয়ার মতো স্থায়ী কল্যাণকর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।