ঢাকা
২৪ জুন ২০২৬
শিরোনাম

ঢাকার পাশে ঘন ঘন ভূমিকম্প: বড় বিপদের আগাম বার্তা

বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিবেদক
বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬   ২০ বার পঠিত
ঢাকার পাশে ঘন ঘন ভূমিকম্প: বড় বিপদের আগাম বার্তা

সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানী ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় একের পর এক ভূমিকম্প অনুভূত হওয়ায় নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে কয়েকটি ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ঢাকার খুব কাছাকাছি হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।

সর্বশেষ গত ২২ জুন রাত ৮টা ২৮ মিনিটে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভূমিকম্প অনুভূত হয়। রিখটার স্কেলে এর মাত্রা ছিল ৪ দশমিক ৪। মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদী থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমে এবং ভূপৃষ্ঠের ১০ কিলোমিটার গভীরে।

বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এর উৎপত্তিস্থল ছিল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায়, যা ঢাকা থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার দূরে।

এর আগে চলতি বছরের ১ ফেব্রুয়ারি গাজীপুরের কালিয়াকৈরে ৩ দশমিক ২ মাত্রার একটি ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়। এ ছাড়া ২০২৫ সালের নভেম্বরে নরসিংদীতে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়, যা গত কয়েক দশকে দেশের অভ্যন্তরে উৎপত্তি হওয়া অন্যতম বড় ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত।

ওই ভূমিকম্পে ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় ক্ষয়ক্ষতি হয়। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নরসিংদী, ঢাকার বাড্ডাসহ আশপাশের এলাকায় আরও কয়েকটি ছোট ভূমিকম্প অনুভূত হয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. বদরুদ্দোজা মিয়া বলেন, সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো স্বাভাবিক টেকটোনিক কার্যকলাপের অংশ হতে পারে। আবার কোনো সক্রিয় ফল্ট বা চ্যুতি রেখার সঙ্গেও এর সম্পর্ক থাকতে পারে।

তিনি বলেন, অনেক সময় নতুন ফল্ট তৈরি হয়, আবার দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকা পুরোনো ফল্টও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে।

ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর জানান, বাংলাদেশ ইউরেশিয়ান, ইন্ডিয়ান ও বার্মিজ—এই তিনটি ভূ-গাঠনিক প্লেটের সংযোগস্থলের কাছে অবস্থান করায় এখানে ভূমিকম্পের প্রবণতা রয়েছে।

তবে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) ভূমিকম্প গবেষক অধ্যাপক মেহেদী আহমেদ আনসারীর মতে, সাম্প্রতিক ছোট ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প থেকে তাৎক্ষণিক বড় ধরনের বিপদের আশঙ্কা নেই। তবে এগুলো মানুষকে ভূমিকম্প প্রস্তুতি ও সচেতনতার বিষয়ে সতর্ক হওয়ার সুযোগ করে দিচ্ছে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের বড় ঝুঁকি রয়েছে এমন ফল্টগুলোর কারণে, যেগুলো অতীতে ৭ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টি করেছে। এর মধ্যে সিলেটের শ্রীমঙ্গল, বগুড়ার শেরপুরসহ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো উল্লেখযোগ্য।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ঢাকার ঝুঁকি শুধু ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের ওপর নির্ভর করে না; ভবনের কাঠামো, মাটির ধরন ও নগর ব্যবস্থাপনাও গুরুত্বপূর্ণ।

ভূতত্ত্ববিদদের মতে, ঢাকার কিছু এলাকার মাটি তুলনামূলক শক্ত হলেও পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের অনেক এলাকায় নরম পলিমাটি রয়েছে, যেখানে অপরিকল্পিত নগরায়ণ ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা জানান, পুরান ঢাকার বড় সমস্যা সরু রাস্তা ও ঘনবসতি। তবে ভবনের গুণগত মান ভালো হলে অনেক পুরোনো ভবনও টিকে থাকতে পারে।

গবেষকদের মতে, ঢাকার জন্য একটি বড় উদ্বেগ হলো ‘ব্লাইন্ড ফল্ট’। এসব চ্যুতি রেখা ভূ-পৃষ্ঠে সরাসরি দেখা যায় না, ফলে এগুলো শনাক্ত করাও কঠিন।

বাংলাদেশে ময়মনসিংহ ও রংপুর এলাকায় এমন ফল্ট শনাক্ত হয়েছে বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এ ধরনের ফল্ট থেকে আকস্মিক ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকতে পারে।

তবে বিশেষজ্ঞদের মত, ঢাকার আশপাশে সাম্প্রতিক ভূমিকম্পগুলো বড় ভূমিকম্পের নিশ্চিত পূর্বাভাস নয়। কিন্তু এসব ঘটনা ভূমিকম্প মোকাবিলায় প্রস্তুতি, ভবনের নিরাপত্তা পরীক্ষা ও জনসচেতনতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা আবারও সামনে এনেছে।

Facebook Comments Box