
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) মুসলিম বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্মরণীয় দিন।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্ম, তাঁর মহান জীবন, কর্ম ও মানবতার জন্য রেখে যাওয়া অনন্য আদর্শ স্মরণের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করেন মুসলমানরা।
তাঁর আগমন আরবের অন্ধকারাচ্ছন্ন সমাজে ন্যায়, সত্য, মানবতা ও শান্তির এক নতুন যুগের সূচনা করে।
ঐতিহাসিক বর্ণনা অনুযায়ী, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) মক্কা নগরীর কুরাইশ বংশের বনু হাশিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।
তাঁর পিতা আবদুল্লাহ ইবনে আবদুল মুত্তালিব তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেন।
মা আমিনা বিনতে ওয়াহাবের স্নেহে শৈশব কাটলেও মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি মাতৃহারা হন।
পরে দাদা আবদুল মুত্তালিব এবং তাঁর মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিবের তত্ত্বাবধানে বেড়ে ওঠেন।
শৈশব থেকেই মহানবী (সা.) ছিলেন সত্যবাদী, বিশ্বস্ত ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী।
তাঁর সততা ও আমানতদারির কারণে মক্কার মানুষ তাঁকে ‘আল-আমিন’ বা বিশ্বস্ত হিসেবে অভিহিত করত।
ব্যবসায়িক জীবনেও তাঁর ন্যায়পরায়ণতা ও সততা তাঁকে সবার কাছে সম্মানিত করে তোলে।
পরবর্তীতে হযরত খাদিজা (রা.)-এর সঙ্গে তাঁর বিবাহ হয়।
চল্লিশ বছর বয়সে হেরা গুহায় মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহি নাজিল হয়।
এর মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর নবুয়তের দায়িত্ব।
তিনি মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত, সত্য, ন্যায় ও মানবতার পথে আহ্বান জানান।
মক্কায় তিনি তাওহিদের বাণী প্রচারের পাশাপাশি শিরক, জুলুম, অন্যায়, সুদ, মদ, মিথ্যা ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
মক্কার বিরোধিতা ও নির্যাতনের মুখেও তিনি সত্যের প্রচার থেকে বিচ্যুত হননি।
পরে আল্লাহর নির্দেশে তিনি মদিনায় হিজরত করেন।
সেখানে তিনি ন্যায়ভিত্তিক ও শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষের সঙ্গে সহাবস্থান, পারস্পরিক অধিকার ও সামাজিক দায়িত্বের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেন, তা মানব ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ছিল ক্ষমা, দয়া, সহনশীলতা ও মানবিকতার অনন্য উদাহরণ।
এতিম, দরিদ্র, অসহায়, নারী, শিশু ও সমাজের দুর্বল মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় তিনি বিশেষ গুরুত্ব দেন।
যারা তাঁর প্রতি নির্যাতন ও অবিচার করেছিল, সুযোগ পেয়েও তাদের অনেককে তিনি ক্ষমা করে দিয়েছেন।
মানুষের মর্যাদা ও পারস্পরিক ভ্রাতৃত্বের ওপর তিনি বিশেষ জোর দেন।
বিদায় হজের ভাষণেও মানবসমাজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনা দেন মহানবী (সা.)।
মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মানের মর্যাদা রক্ষা, নারীর অধিকার, পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ব এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকার শিক্ষা তাঁর বক্তব্যে গুরুত্ব পায়।
বংশ, জাতি বা গোত্রের অহংকারের পরিবর্তে মানুষের নৈতিকতা ও মর্যাদাকে প্রাধান্য দেওয়ার বার্তাও তাঁর শিক্ষার অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
ঈদে মিলাদুন্নবীর তাৎপর্য কেবল আনুষ্ঠানিকতা বা উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
মহানবী (সা.)-এর জীবন ও সুন্নাহ থেকে শিক্ষা নিয়ে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে সত্য, ন্যায়, সততা, সহমর্মিতা ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই এ দিনের অন্যতম শিক্ষা।
তাঁর আদর্শ অনুসরণের মাধ্যমে হিংসা, বিদ্বেষ, বৈষম্য ও অন্যায় দূর করে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার পথ সুগম হতে পারে।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে ধর্মীয় আলোচনা, মিলাদ মাহফিল, দোয়া ও বিশেষ মোনাজাতের আয়োজন করা হয়।
এসব আয়োজনে মহানবী (সা.)-এর জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা এবং তাঁর আদর্শ ব্যক্তি ও সমাজজীবনে বাস্তবায়নের আহ্বান জানানো হয়।
মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবন শুধু মুসলমানদের জন্য নয়, সমগ্র মানবতার জন্য নৈতিকতা, ন্যায়, শান্তি ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) সেই মহান জীবন ও আদর্শকে নতুন করে স্মরণ এবং তাঁর শিক্ষার আলোকে নিজেদের জীবন গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
