হবিগঞ্জের মাধবপুর ও চুনারুঘাট উপজেলার চা বাগানগুলোতে দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবিতে আন্দোলনে অনড় রয়েছেন চা শ্রমিকরা।
দাবি আদায়ে টানা আট দিন ধরে প্রতিদিন দুই ঘণ্টা করে কর্মবিরতি পালন করছেন তারা।
চুনারুঘাট উপজেলার ১৮টি চা বাগানসহ বিভিন্ন বাগানে এ কর্মসূচি চলছে।
শ্রমিক নেতারা বলছেন, দাবি মেনে নেওয়া না হলে আন্দোলন আরও জোরদার করা হবে এবং কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হতে পারে।
শ্রমিকদের অভিযোগ, চা বাগানের সূচনালগ্ন থেকেই তারা নানা ধরনের বঞ্চনা ও শোষণের মধ্যে জীবনযাপন করে আসছেন।
বর্তমানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় দৈনিক ১৮৭ টাকা মজুরি দিয়ে একটি পরিবারের ব্যয় নির্বাহ করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাই দৈনিক মজুরি ৫০০ টাকা করার দাবি জানিয়েছেন তারা।
শ্রমিকরা জানান, ২০২২ সালে ধারাবাহিক আন্দোলনের পর দৈনিক মজুরি ৫০ টাকা বাড়িয়ে ১৮৭ টাকা করা হয়।
সম্প্রতি চা বাগান মালিকপক্ষ আরও ৫ শতাংশ মজুরি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে।
তবে শ্রমিকরা সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে ৫০০ টাকা হাজিরার দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন।
চুনারুঘাটের চান্দপুর চা বাগানের শ্রমিক নেত্রী খাইরুন আক্তার বলেন, ‘চা শ্রমিকরা যুগের পর যুগ বাগানে কঠোর পরিশ্রম করে আসছেন।
রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে কাজ করেও তারা ন্যায্য মজুরি পাচ্ছেন না।
বর্তমানে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম অনেক বেড়েছে।
অথচ একজন শ্রমিক সারা দিন কাজ করে মাত্র ১৮৭ টাকা হাজিরা পান।
এই সামান্য টাকায় একটি পরিবার কীভাবে চলবে, তিনি বলেন, চা শ্রমিকদের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আবাসন, নিরাপদ পানীয় জল ও চিকিৎসাসেবা দেওয়ার কথা থাকলেও অনেক বাগানে এসব সুবিধা নামমাত্র।
এতে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার মান দিন দিন কঠিন হয়ে পড়ছে।
ন্যায্য দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে।
চান্দপুর চা বাগানে খাইরুন আক্তারের সঙ্গে গীতা রানি কানু, মোহন রবিদাসসহ ছাত্র, যুবক ও সাধারণ শ্রমিকরা আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
তবে শ্রমিকদের দাবির বিষয়ে ভিন্ন বক্তব্য দিয়েছে চা বাগান মালিকপক্ষ।
তাদের দাবি, বর্তমানে চা শিল্প নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
অনেক বাগান প্রতিবছর লোকসান গুনছে।
এক কেজি চা উৎপাদনে ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি খরচ হলেও সেই অনুপাতে চায়ের দাম ও বাজার বাড়েনি।
গ্যাস, বিদ্যুৎ, সার, কীটনাশক, পরিবহন ও যন্ত্রপাতিসহ উৎপাদনের প্রায় সব খাতেই ব্যয় বেড়েছে।
বৈকুণ্ঠপুর চা বাগানের শামসুল ইসলাম ভূঁইয়া জানান, তাদের বাগানে প্রতিবছর লোকসান হচ্ছে। ব্যাংক ঋণের পরিমাণও বাড়ছে।
উৎপাদিত চায়ের দাম আশানুরূপ না হওয়ায় বাগান পরিচালনা কঠিন হয়ে পড়েছে।
নোয়াপাড়া চা বাগানের ম্যানেজার সোহাগ মাহমুদ জানান, অর্থসংকটের কারণে তাদের কারখানা প্রায় দুই বছর বন্ধ ছিল।
বর্তমানে কারখানা চালু হলেও পূর্ণ সক্ষমতায় চা উৎপাদন করা যাচ্ছে না।
ব্যাংক ঋণও পাওয়া যাচ্ছে না।
পাশাপাশি বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যার কারণে নিয়মিত লোডশেডিং হচ্ছে।
বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক রামভজন কৈরি বলেন, ‘চা শ্রমিকদের দৈনিক ৫০০ টাকা মজুরির দাবি অত্যন্ত যুক্তিসংগত।
শ্রমিকরা রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে বাগানে কঠোর পরিশ্রম করেন।
অথচ সেই তুলনায় তাদের মজুরি খুবই কম।
বর্তমান বাজারদরের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ করা জরুরি।
শ্রমিক নেতারা জানান, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত কর্মবিরতিসহ আন্দোলন চলবে।
দ্রুত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান না হলে আগামী দিনে আন্দোলন আরও জোরদার হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।