
একই সড়ক, অথচ দুই পাশে দুই ইউনিয়ন।
একপাশে হেঁটে গেলে প্রশাসনিক পরিচয় মুন্সীরহাট, অন্য পাশে গেলে দরবারপুর।
গ্রামের নামের সাথে ইউনিয়নের মিল নেই, আবার দৈনন্দিন জীবনের প্রধান কেন্দ্র ‘বাজার’টি কেটে ভাগ করা হয়েছে দুই প্রশাসনিক সীমানায়।
ফেনীর ফুলগাজী উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় বিগত ৬৪ বছর ধরে চলা এই সীমানা জটিলতায় চরম প্রশাসনিক ভোগান্তিতে পড়েছেন হাজার হাজার বাসিন্দা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ফেনী-পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের সিলোনিয়া নদীর সেতু এলাকা থেকে উত্তর দিকে গেলে সড়কের একপাশে দরবারপুর ইউনিয়ন এবং অন্যপাশে মুন্সীরহাট ইউনিয়নের দক্ষিণ শ্রীপুর এলাকা।
এ এলাকার খুব কাছেই অবস্থিত ফুলগাজী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সটি দরবারপুর ইউনিয়নের অধীনে।
অথচ ঠিক সামান্য দূরে অবস্থিত ফতেহপুর গ্রাম এবং নতুন মুন্সীরহাট বাজার পড়েছে মুন্সীরহাট ইউনিয়নের মধ্যে।
সবচেয়ে অদ্ভুত ভৌগোলিক অবস্থা দেখা যায় ইউনিয়ন পরিষদগুলোর অবস্থানে।
পুরোনো মুন্সীরহাট বাজারের কাছে অবস্থিত দরবারপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়।
অন্যদিকে, ফেনী–পরশুরাম আঞ্চলিক সড়কের পাশে ফতেহপুর মৌজার নতুন মুন্সীরহাট বাজারে বসানো হয়েছে মুন্সীরহাট ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়।
ফলে একই বাজার ও চিকিৎসাকেন্দ্র ঘিরে দৈনিক যাতায়াত থাকলেও প্রশাসনিক কাগজে-কলমে বিচ্ছিন্ন এখানকার মানুষ।
মুন্সীরহাট ইউনিয়নের কামাল্লা, পৈথারা, দক্ষিণ তারালিয়া, কমুয়া, বালুয়া, দক্ষিণ শ্রীপুর ও কুতুবপুরসহ বহু গ্রামের মানুষের মূল কেন্দ্র এই বাজার।
অপরদিকে, বসন্তপুর, জগতপুর ও দক্ষিণ বরইয়া গ্রামের অধিবাসীদের নিজ ইউনিয়ন পরিষদে যেতে হলে অন্য ইউনিয়নের ভবনের সামনে দিয়ে প্রায় তিন কিলোমিটার পথ ঘুরে যেতে হয়।
ফতেহপুর গ্রামের বাসিন্দা দেলোয়ার হোসেন আক্ষেপ করে বলেন, “একই রাস্তার দুই পাশে দুই ইউনিয়ন হওয়ায় সাধারণ মানুষ মারাত্মক প্রশাসনিক বিভ্রান্তিতে পড়েন।
এনআইডি, সনদপত্র বা জরুরি সেবা নিতে গেলে ভোগান্তির শেষ থাকে না।”
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, এই সীমানা জটিলতার সূচনা হয় পাকিস্তান আমলে, ১৯৬২ সালের ‘বেসিক ডেমোক্রেসি’ ব্যবস্থার প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের সময়।
পরবর্তীতে তৎকালীন বৃহত্তর মুন্সীরহাট ইউনিয়ন ভেঙে মুন্সীরহাট ও দরবারপুর—এই দুই ইউনিয়নে রূপ নেয়।
সর্বশেষ ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী, মুন্সীরহাট ইউনিয়নের জনসংখ্যা ২২ হাজার ৬৭ জন (আয়তন ১৮.৩৩ বর্গকিমি) এবং দরবারপুর ইউনিয়নের জনসংখ্যা ১৭ হাজার ২৩৮ জন (আয়তন ১১.৬২ বর্গকিমি)।
বিগত ছয় দশক ধরে এই সীমানা অপরিবর্তিত থাকায় স্থানীয় জনবসতি, বাজার কেন্দ্রিক জীবনযাত্রা এবং যাতায়াতের বাস্তবতার সাথে প্রশাসনিক ম্যাপের কোনো মিল নেই।
এ বিষয়ে ফুলগাজী উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা পল্লবী চাকমা জানান, সীমানা নির্ধারণের বিষটি সম্পূর্ণ স্থানীয় সরকার বিভাগের এখতিয়ারভুক্ত।
দীর্ঘ ছয় দশকের এই জটিলতা নিরসনে জনস্বার্থে ও বাস্তবতার আলোকে দুই ইউনিয়নের সীমানা পুনর্মূল্যায়নের জন্য উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ভুক্তভোগী এলাকাবাসী।
