দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা বৈশ্বিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, এমনকি সম্ভবত ইতোমধ্যে ভেঙেই গেছে। তবে এর বিকল্প কোনো কাঠামো এখনো তৈরি হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিস্টিংগুইশড অধ্যাপক আলী রীয়াজ। শনিবার (৩ অক্টোবর) পঞ্চম বে অব বেঙ্গল কনভারসেশনের ‘দ্য ফার্স্ট কনভারসেশন, এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন: পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন দ্য এজ অব আনসার্টেনিটি’ শীর্ষক সেশনে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

নতুন বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থায় মধ্যম শক্তির দেশগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে, এমন ধারণাকে অনেকটা প্রচারণা ও অতিরঞ্জিত প্রত্যাশা বলে মন্তব্য করেন আলী রীয়াজ। তার মতে, মধ্যম শক্তিগুলো এখনো বৈশ্বিক ব্যবস্থায় নির্ধারক ভূমিকা নেওয়ার অবস্থানে পৌঁছায়নি। ‘মাল্টিপোলার’ বা বহুমেরুকেন্দ্রিক শব্দটির ব্যবহার নিয়েও আপত্তি জানান তিনি। তার বদলে ‘মাল্টিপ্লেয়ার’ শব্দটি বেশি উপযুক্ত বলে মনে করেন তিনি। কারণ, বর্তমানে এমন কোনো শক্তির ভারসাম্য তৈরি হয়নি, যেখানে একটি শক্তি অন্য দেশগুলোকে নিজের নেতৃত্বে কার্যকরভাবে যুক্ত করতে পারে।

আলী রীয়াজ বলেন, মধ্যম শক্তির উত্থানের যুক্তি হলো, প্রধান আধিপত্যশীল শক্তির নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়লে তারা সেই শূন্যস্থান পূরণ করবে। কিন্তু বাস্তবে এখনো তা ঘটেনি। এসব দেশের মধ্যে কোনো অভিন্ন বা একক বৈশ্বিক এজেন্ডাও নেই। তার মতে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর প্রধান শক্তিগুলোর মধ্যে কিছু মৌলিক বিষয়ে অন্তত ন্যূনতম ঐকমত্য ছিল। বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও নতুন কোনো আধিপত্যশীল শক্তি সেই জায়গা নিতে পারেনি। এমনকি মার্কিন নেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার অবসান যারা চান, তাদের অনেকেই চীনকে নতুন বৈশ্বিক আধিপত্যশীল শক্তি হিসেবে দেখতে প্রস্তুত নন।

বহুপক্ষীয়তা শক্তিশালী হবে, এমন ধারণার ক্ষেত্রেও সংশয় প্রকাশ করেন তিনি। উদাহরণ হিসেবে ব্রিকসের কথা উল্লেখ করে বলেন, প্রায় দুই দশক ধরে জোটটি থাকলেও এর বাস্তব অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। অভিন্ন এজেন্ডার অভাবে অনেক সময় সদস্য দেশগুলো যৌথ বিবৃতিতেও একমত হতে পারেনি।তিনি আরও বলেন, অনেক মধ্যম শক্তির দেশেই আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে জনতুষ্টিবাদী নেতাদের উত্থান পরিস্থিতিকে আরও জটিল করছে। সমাজে বিভাজন বাড়লে দেশগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাও কমে যায়।

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর মানুষের আস্থাও কমেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, জাতিসংঘ ও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার মতো প্রতিষ্ঠানগুলো যে বৈশ্বিক বাস্তবতার জন্য গড়ে উঠেছিল, সেটি এখন আর আগের মতো নেই। তাই এসব প্রতিষ্ঠানের বড় ধরনের সংস্কার প্রয়োজন।

আগামী বছরগুলোতে জাতিসংঘের নির্ধারক ভূমিকা থাকবে কি না, তা নিয়েও সংশয় প্রকাশ করেন আলী রীয়াজ। তার মতে, শুধু নতুন মহাসচিব দায়িত্ব নিলেই বড় পরিবর্তন আসবে না। পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থার সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার ও অভিযোজন জরুরি।

বর্তমান সময়কে বৈশ্বিক পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এই পরিবর্তন কোন পথে যাবে তা এখনো স্পষ্ট নয়। বিভিন্ন পক্ষের প্রতিযোগিতা ও বিরোধের কারণে এর নানা অসুস্থতার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে তিনি ট্রাম্পের বাণিজ্যনীতিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহারের প্রবণতার কথা উল্লেখ করেন। তবে পরিস্থিতি পরিবর্তন হবে এবং পরিবর্তন প্রয়োজন, এ বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেন আলী রীয়াজ। একই সঙ্গে মধ্যম শক্তিগুলোকে ঘিরে অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করে বৈশ্বিক বিশ্বব্যবস্থাকে নতুনভাবে ভাবার আহ্বান জানান তিনি।

তুলনামূলক ছোট দেশগুলোকেও নিজেদের ভূমিকা নতুন করে নির্ধারণ করতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, বিভিন্ন শক্তির মধ্যে ভারসাম্য রেখে চলার ‘হেজিং’ ও ‘ব্যালান্সিং’ কৌশল নিকট ভবিষ্যতে আগের মতো কার্যকর নাও হতে পারে।

সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের আয়োজনে ‘ফ্র্যাগমেন্টস, ফ্রন্টিয়ার্স, ফিউচারস: নেভিগেটিং পাওয়ার, টেকনোলজি অ্যান্ড ট্রাস্ট ইন এ ওয়ার্ল্ড রিরিটেন’ প্রতিপাদ্যে তিন দিনব্যাপী বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে শতাধিক দেশের নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক, ব্যবসায়ী, গবেষক, শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নিয়েছেন।