জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকার সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষা, নীতিমালার ধারাবাহিকতা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ আয়োজিত তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। বাসসের প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার এখন প্রতিশ্রুতি থেকে বাস্তবায়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশকে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে গড়ে তোলা এবং উৎপাদন ও বিনিয়োগের শক্তিশালী কেন্দ্রে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উৎপাদন, সেবা ও রপ্তানি খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথাও জানান তিনি।
সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবচেয়ে সুবিধাবঞ্চিত মানুষকে অগ্রাধিকার দিয়ে এসব কর্মসূচি সাজানো হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে পরিবারের মায়ের হাতে আর্থিক সহায়তা, কৃষক কার্ডের মাধ্যমে কৃষকদের সরকারি প্রণোদনা ও সেবার সঙ্গে যুক্ত করা এবং হেলথ কার্ডের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি। ভবিষ্যতে ইউনিভার্সাল কার্ডের মাধ্যমে সমন্বিত সরকারি সেবা দেওয়ার লক্ষ্যও জানান।
স্বাস্থ্য খাতে এক লাখ স্বাস্থ্যসেবাকর্মী নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাদের প্রায় ৮০ শতাংশ নারী হবেন। তারা তৃণমূল পর্যায়ে প্রাথমিক চিকিৎসা, স্বাস্থ্য পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় রেফারেল সেবা দেবেন।
শিক্ষাব্যবস্থায় আনন্দময় পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার উদ্দেশ্য শুধু সনদ অর্জন নয়, শিক্ষার্থীদের বাস্তব জীবনের জন্য প্রস্তুত করা। পাঠ্যক্রমে সংস্কৃতি, খেলাধুলা, মূল্যবোধ ও নৈতিকতার পাশাপাশি তৃতীয় ভাষা শেখার সুযোগ এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার প্রসার ঘটানোর পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।
তরুণদের দক্ষতা ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভাষাগত দক্ষতা, প্রযুক্তিগত রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়ানোর পাশাপাশি উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও স্টার্টআপে সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। দেশের তরুণদের বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতার উপযোগী করে গড়ে তোলার কথাও বলেন তিনি।
কৃষিকে অর্থনীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী প্রযুক্তি, সেচ, কৃষি অর্থায়ন ও বাজারসংযোগ সহজ করার কথা জানান। মৎস্য, প্রাণিসম্পদ ও গ্রামীণ উদ্যোক্তাদের সহায়তার পাশাপাশি কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
পানি নিরাপত্তার বিষয়ে আগামী পাঁচ বছরে ২০ হাজার কিলোমিটার খাল ও জলপথ খননের পরিকল্পনার কথা জানান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা প্রণয়নের কথা বলেন তিনি।
পরিবেশ সুরক্ষায় আগামী পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ানো, বর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশবান্ধব শিল্প গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উন্নয়নের জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা জোরদারের পাশাপাশি মানবাধিকার, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ এখনো প্রায় ১২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়ে যাচ্ছে। মিয়ানমারে তাদের দ্রুত, স্বেচ্ছায়, নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করাকে সরকারের প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। এ জন্য আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক সমর্থন ও অর্থায়নের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন।
বঙ্গোপসাগরকে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক সম্ভাবনার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী সমুদ্রবন্দর, নৌপথ ও উপকূলীয় অর্থনীতির মাধ্যমে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক যোগাযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেন। বাণিজ্য, জ্বালানি, শিক্ষা, প্রযুক্তি, জলবায়ু ও সমুদ্র খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের আহ্বান জানান তিনি।
‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’ সম্মেলনটি ৩ থেকে ৫ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এতে বিভিন্ন দেশের সাবেক ও বর্তমান কর্মকর্তা, কূটনীতিক, নীতিনির্ধারক, গবেষক, ব্যবসায়ী, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা অংশ নিচ্ছেন।


মন্তব্য করুন