চট্টগ্রামের ডিসির মানবিকতায় বন্দি জীবনের ইতি, স্বপ্ন দেখছেন শওকত

রবিবার, ২৪ মে ২০২৬ | ৭:১৫ অপরাহ্ণ

চট্টগ্রামের ডিসির মানবিকতায় বন্দি জীবনের ইতি, স্বপ্ন দেখছেন শওকত
apps

জন্মের পর থেকে দীর্ঘ ২৬টি বছর কেটেছে ঘরের অন্ধকার কোণে। যেখানে চারপাশের দেয়ালগুলোই ছিল ২৮ বছর বয়সী শওকত হোসেনের পুরো পৃথিবী। নিজের পায়ে দাঁড়ানো তো দূরের কথা, একটু নড়াচড়া করার স্বাধীনতাও কেড়ে নিয়েছিল প্যারালাইসিস। তবে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর চট্টগ্রামের ‘মানবিক ডিসি’র এক অনন্য উদ্যোগে অবশেষে ভাঙল সেই বন্দিদশা। শওকতের জীবনে এলো ডানা মেলার নতুন স্বাধীনতা।

​শনিবার (২৩ মে) বিকেলে চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে দেখা গেল এক আবেগঘন দৃশ্য। একটি চকচকে নতুন মোটরচালিত হুইলচেয়ারে বসে আছেন শওকত। মুখে লাজুক হাসি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মা সানু বেগমের চোখ বেয়ে ঝরছে আনন্দের অশ্রু। এ যেন শুধু একটি হুইলচেয়ার প্রাপ্তি নয়, এক মায়ের বহু বছরের জমানো কষ্টের অবসান।

​কষ্টের ডায়েরি ও এক মায়ের লড়াই

​চট্টগ্রামের বন্দর থানার ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা শওকতের বাবা নুর মোহাম্মদ পেশায় একজন সাধারণ নিরাপত্তাকর্মী। সামান্য আয়ে যেখানে সংসার চালানোই দায়, সেখানে পঙ্গু সন্তানের চিকিৎসা ও ওষুধের খরচ মেলাতে পরিবারটি ছিল বিপর্যস্ত। একটা সাধারণ হুইলচেয়ার কেনার সামর্থ্যও ছিল না তাদের।
​সানু বেগম আক্ষেপ করে বলেন,

​”বৃষ্টির সময় ঘরের ফুটো ছাদ দিয়ে পানি পড়ত, আমার পঙ্গু ছেলেটা সরতে না পেরে ভিজে থাকত। একটা হুইলচেয়ারের জন্য কত মানুষের দ্বারে দ্বারে গেছি। কেউ আশ্বাস দিয়েছে, কেউ ফিরিয়ে দিয়েছে।”

​যেখানে ফিরল মানবতার আলো

​সব পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর গত বুধবার সানু বেগম হাজির হন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞার দপ্তরে। মায়ের আকুতি ফেলে দেননি দেশজুড়ে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তা।
​সানু বেগমের ভাষায়, “আমি তো লজ্জায় মোটরচালিত হুইলচেয়ারের কথা বলতেও পারিনি। ভেবেছিলাম সাধারণ একটা পেলেই হবে। কিন্তু স্যার আমার সব কথা এত ধৈর্য ধরে শুনলেন এবং তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিলেন।”

এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব”

​সহায়তা প্রদানকালে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক। এ সময় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন,
​”সমাজের অসহায় ও প্রতিবন্ধী মানুষের পাশে দাঁড়ানো আমাদের কোনো দয়া নয়, এটি আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। জেলা প্রশাসন সবসময় মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সাধারণ মানুষের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও এই ধারা অব্যাহত থাকবে।”

​এক নতুন বিকেলের গল্প

​চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের ঐতিহাসিক লাল ভবনের সামনে সেদিন কোনো বড় রাজনৈতিক সভা বা রাষ্ট্রীয় জাঁকজমক ছিল না। কিন্তু নিভৃতেই ঘটে গেল এক জীবনের পটপরিবর্তন।

​বিকেলের মৃদু বাতাসে শওকতের হুইলচেয়ারের চাকা যখন ঘুরছিল, তখন মায়ের চোখে ছিল পরম স্বস্তি। কখনো কখনো একটি হুইলচেয়ার কেবল চলাচলের মাধ্যম হয় না; এটি হয়ে ওঠে বেঁচে থাকার নতুন সাহস, নতুন স্বাধীনতা এবং মানুষের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনার এক জীবন্ত প্রতীক।

Development by: webnewsdesign.com