
রাজশাহী নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের জন্য একসময় প্রসিদ্ধ ছিলো এই ঢোপকল। সেসময় রাজশাহী শহরে পানযোগ্য পানির খুব কষ্ট ছিলো।
‘তখন বিশুদ্ধ পানির খুবই অভাবে কলেরা-আমাশয়সহ পেটের নানান অসুখ ছড়িয়ে পড়েছিল। বেশ কিছু মানুষের মৃত্যুও হয়েছিল।
তাইতো নিজ গর্ভ থেকে উদার চিত্তে তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি দিয়ে অতীতে রাজশাহীবাসীর জীবন রক্ষা করেছিল ঢোপকলগুলো এজন্য সবার স্মরণে আছে। এখন যা রাজশাহীর ঐতিহ্য। কিন্তু অন্য ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন ঢোপকলগুলোও এক এক করে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো রক্ষার উদ্যোগ নেই।
জানা যায়, পুঠিয়ার মহারানি হেমন্ত কুমারী নিজেই দান করেন প্রায় ৬৫ হাজার টাকা। বিশাল অঙ্কের একক অনুদানে এই ঢোপকলগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। মহারানি হেমন্তকুমারীর বিরাট অঙ্কের একক দানের প্রতি কৃতজ্ঞতা স্বরুপ এর নাম ‘রাজশাহী ওয়াটার ওয়ার্কস’ এর বদলে দেয়া হলো ‘মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস’। ১৯৩৭ সালের ১৪ আগস্ট যাত্রা শুরু করলো মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কস নামে। নগরীর হেতম খাঁ এলাকায় রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে নির্মাণ করা হলো পানি শোধনাগার। এতে ব্যয় হয় ২,৫৩,২৮৫ টাকা।
মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের অধীনে রাজশাহীর নগরীর মোড়ে মোড়ে স্থাপিত হলো পানির ঢোপকল। নগরবাসী এই ধরনের পানির কল আগে দেখেনি। তাদের কাছে এটি পরিচিত হয়ে উঠলো ‘মহারানীর ঢোপকল’ বা ‘হেমন্তকুমারীর ঢোপকল’ বা শুধু ‘ঢোপকল’ নামে। পরবর্তী দিনগুলোতে এই ঢোপকলগুলোই পরিণত হলো নগরীর বিশুদ্ধ পানির প্রধান উৎস।
মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের অধীনে নগরীর মোড়ে মোড়ে নির্মিত হয় শতাধিক ঢোপকল। এগুলো একাধারে ছিলো রিজার্ভার এবং কল। প্রতিটি ঢোপকল এর উচ্চতা ভূমি থেকে ১২ ফুট এবং ব্যাস ৪ ফুট। প্রতিটি ঢোপকল ৪৭০ গ্যালন পানি ধারণ করতে পারতো। নিচের দিকে থাকতো একটি ট্যাপ যা দিয়ে পানি সংগ্রহ করা হতো। সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই করে একেকটি ঢোপকল তৈরি হতো। টিনের সাহায্যে ঢেউ খেলানো নকশা করা হতো এতে। অত্যন্ত মজবুত করে তৈরি করা হতো একেকটি ঢোপকল।
প্রতিটি ঢোপকল ভূগর্ভস্থ পাইপ লাইনের মাধ্যমে যুক্ত ছিলো নগরীর হেতম খাঁ-তে অবস্থিত পানি শোধন কেন্দ্রের সাথে। পাইপগুলো ছিলো কাস্ট আয়রনের আর অন্যান্য ফিটিংসগুলো ছিলো পিতলের তৈরি। কেবলমাত্র সিমেন্টের ঢোপকল বাদ দিয়ে বাকি সব জিনিসপত্রই ইংল্যান্ড থেকে আনা হয়েছিলো।
হেতম খাঁয় অবস্থিত মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের দৈনিক ৭০০ ঘন মিটার ভূগর্ভস্থ পানি শোধন করার ক্ষমতা ছিল। এখানে ভূগর্ভস্থ পানির ক্ষরতা ও পানিতে থাকা আয়রন পরিশোধন ও জীবাণুমুক্ত করে পাঠানো হত ঢোপকলগুলোতে। পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন দুই ঘন্টা করে পানি সরবরাহ করা হত। সেই পানি জমা থাকতো ঢোপকলগুলোতে। ফলে ঢোপকলগুলো থেকে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। প্রতিটি ঢোপকলে বালি ও পাথর এর স্তর দিয়ে তৈরি রাফিং ফিল্টার ছিলো। ফলে পরিশ্রুত পানি আরো পরিশ্রুত হয়ে বের হত। এছাড়া গরমের সময় ঠান্ডা পানিও পাওয়া যেত।
প্রতিটি ঢোপকল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হত। প্রতিটি ঢোপকলের ওপরে থাকতো ঢাকনা। এটি দিয়ে ভেতরে মানুষ প্রবেশ করতে পারতো। প্রতি দুই মাস অন্তর পৌরসভার কর্মীরা এর ভেতরে ঢুকে জীবানুনাশক দিয়ে ঢোপকলগুলো আগা-গোড়া ধুয়ে পরিষ্কার করতো। এছাড়াও প্রতি দুই মাস অন্তর অন্তর শহরের প্রতিটি ঢোপকল থেকে পানির নমুনা সংগ্রহ করে পাঠানো হতো ল্যাবে। পানির গুণগত মান যেন বজায় থাকে তা নিশ্চিত করা হতো। এককথায় বলা যায়, সেই সময়ে রাজশাহী নগরবাসী পেয়েছিলো অসাধারণ এবং নিরাপদ এক পানি সরবরাহ ব্যবস্থা।
বিলুপ্তির সূচনা
কোনো ব্যবস্থাই চিরদিন মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে পারে না। ঢোপকলের মাধ্যমে এই পানি সরবরাহ ব্যবস্থাও পারেনি। সময়ের সাথে সাথে রাজশাহীর জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেতে থাকে। বাড়তে থাকে নগরীর আকার। একসময়ের পানির প্রধান উৎস ঢোপকলগুলো আর নগরবাসীর চাহিদা পূরণ করতে পারছিল না। প্রয়োজন হয় নতুন প্রযুক্তির।
১৯৬১ সালে নতুন নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে নগরীর পানি সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হয়। নগরজুড়ে বেশ কয়েকটি বিরাটাকারের ওভার হেড পানির ট্যাঙ্ক তৈরি করা হয়। নগরে গড়ে ওঠে সমান্তরাল আরেকটি পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ১৯৬৫ সালে মহারানী হেমন্তকুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়। ঢোপকলগুলো যুক্ত হয় নতুন পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে। তখনও অবশ্য ঢোপকলগুলোর গুরুত্ব তেমন কমেনি। ১৯৮৭ সালে রাজশাহী পৌরসভা পরিণত হয় রাজশাহী পৌর কর্পোরেশনে। ১৯৯০ সালে ‘মিউনিসিপালিটি’ শব্দের বদলে ‘সিটি’ শব্দের ব্যবহার শুরু হয়। যাত্রা শুরু হয় সিটি কর্পোরেশনের।
সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে ১৯৯৪ সালে এক প্রকল্পের অধীনে বাসা বাড়িতে পানির সংযোগ দেয়া শুরু হয়। তখন থেকেই মূলত ঢোপকলগুলো গুরুত্ব কমতে থাকে। এরপর যত দিন য়ায় ঢোপকলের গুরুত্ব ততই হ্রাস পেতে থাকে।
বর্তমান অবস্থা
বর্তমানে রাজশাহীতে ঢোপকল বিলুপ্তির পথে। সবশেষ গত (২৪ জানুয়ারি ২২) সোমবার মহানগরীর ফুদকিপাড়া এলাকা সুরেশ স্মৃতি সড়কের পাশের ঢোপকলটি ভেঙে ফেলা হয়েছে। এই ঢোপকলটি এখনও সচল ছিল। পাইপলাইনের মাধ্যমে রাজশাহী পানি সরবরাহ ও পয়ঃনিষ্কাশন কর্তৃপক্ষের (ওয়াসা) পানি আসত। এভাবে একের পর এক ভেঙে ফেলায় শহরে ঢোপকলের সংখ্যা কমে প্রায় ১৫টিতে নেমেছে।
এছাড়াও রাস্তা সম্প্রসারণ ও নানা উন্নয়ন প্রকল্পের স্বার্থে ভেঙে ফেলা হয়েছে অনেক ঢোপকল। ২০১৬ সালের নগরীতে ৪৭টি ঢোপকল টিকে ছিলো। এর মধ্যে ৩৩টিতে তখনও পানি সরবরাহ চালু ছিলো। এই কয়েক বছরে সংখ্যাটি আরো হ্রাস পেয়েছে। ঢোপকলগুলো এখন পরিচালনা করছে রাজশাহী ওয়াসা। তবে সেগুলোকে সংস্কারের ব্যাপারে তারা আর আগ্রহী না। কারণ এগুলো সাধারণ মানুষের ব্যবহারের জন্য। এখান থেকে কোনো রাজস্ব আয় হয় না। আর ঢোপকলগুলোও আধুনিক পানি সরবরাহ ব্যবস্থার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নয়।
সম্প্রতি সিটি কর্পোরেশন ও বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে বেশ কিছু ঢোপকল সংস্কার করা হয়েছে। এগুলো আর পানি সরবরাহে ব্যবহার করা হয় না। বরং ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে নগরের শোভাবর্ধনের কাজে ব্যবহুত হয়। নগরীর বিভিন্ন মোড়ে এখন এই ধরনের বেশ কিছু ঢোপকল দেখা যায়।
রাজশাহীর ইতিহাসের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে এই ঢোপকলগুলো। দীর্ঘ প্রায় আশিটি বছর ধরে এগুলো মিটিয়ে এসেছে রাজশাহীবাসীর পানির তৃষ্ণা। এখন কালের বিবর্তনে এই ঐতিহ্য বিলুপ্তির পথে। তারপরও টিকে থাকা ঢোপকলগুলো সাক্ষ্য বহন করছে।
ফুদকিপাড়া এলাকার ঢোপকলটি ভেঙে ফেলার বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) রাজশাহী শাখার সভাপতি আহমদ সফি উদ্দিন বলেন, ‘ঐতিহ্যের ঢোপকলগুলো ভেঙে ফেলা সাংস্কৃতিক অপরাধ। পৃথিবীর অন্যান্য শহরে এ ধরনের ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য অর্থ খরচ করা হয়। রক্ষা করা হয়। আর আমরা ভাঙছি।’ তবে রাজশাহী ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী পারভেজ মামুদ বলেন, ‘একটা সময় এটার প্রয়োজন ছিল। এখন নেই। এখনকার যুগের সাথে ঢোপকলগুলো আর চলে না।’
