বিশ্বজুড়ে প্রতি আটটি ক্যানসারের একটি সংক্রমণের সঙ্গে সম্পর্কিত। নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব সংক্রমণের বড় একটি অংশ টিকা, নিয়মিত পরীক্ষা ও যথাযথ চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ করা সম্ভব।
চিকিৎসাবিষয়ক সাময়িকী দ্য ল্যানসেট অনকোলজি-তে প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে প্রায় ২৩ লাখ নতুন ক্যানসার শনাক্তের পেছনে বিভিন্ন সংক্রমণের ভূমিকা ছিল। এটি ওই বছরের মোট ক্যানসার শনাক্তের প্রায় ১২ শতাংশ।
গবেষকদের মতে, সংক্রমণজনিত ক্যানসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে হেলিকোব্যাকটার পাইলোরি বা এইচ পাইলোরি এবং হিউম্যান প্যাপিলোমাভাইরাস বা এইচপিভির। ২০২৪ সালে শুধু এই দুই সংক্রমণের সঙ্গে ১৫ লাখের বেশি ক্যানসারের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া হেপাটাইটিস বি ভাইরাস প্রায় ৩ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এর বেশিরভাগই লিভার ক্যানসার। এপস্টাইন-বার ভাইরাস প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার এবং হেপাটাইটিস সি ভাইরাস প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত ছিল।
গবেষণায় বলা হয়েছে, সংক্রমণজনিত ক্যানসারের বোঝা বিশ্বের সব অঞ্চলে সমান নয়। এ ধরনের ক্যানসারের প্রায় ৭৭ শতাংশ নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে দেখা যায়। টিকা, পরীক্ষা, স্ক্রিনিং ও চিকিৎসাসেবায় সুযোগের পার্থক্য এর অন্যতম কারণ।
গবেষকদের মতে, ক্যানসারের সঙ্গে যুক্ত শীর্ষ পাঁচটি সংক্রমণের মধ্যে চারটির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিরোধের ব্যবস্থা রয়েছে। এইচপিভি ও হেপাটাইটিস বি প্রতিরোধে টিকা রয়েছে। অন্যদিকে এইচ পাইলোরি ও হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব।
এইচ পাইলোরি পাকস্থলীতে দীর্ঘস্থায়ী প্রদাহ সৃষ্টি করতে পারে এবং পাকস্থলীর ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার পর উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসার মাধ্যমে ঝুঁকি কমানো সম্ভব।
হেপাটাইটিস সি শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়াও পরবর্তী সময়ে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করতে পারে। একইভাবে হেপাটাইটিস বি-এর টিকা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধের মাধ্যমে লিভার ক্যানসারের ঝুঁকি কমাতে ভূমিকা রাখে।
এইচপিভির ক্ষেত্রেও টিকা গুরুত্বপূর্ণ। এই ভাইরাস জরায়ুমুখ, পায়ুপথ, পুরুষাঙ্গ, যোনি, ভালভা এবং মুখ ও গলার কিছু ক্যানসারের সঙ্গে সম্পর্কিত। টিকাদানের মাধ্যমে এইচপিভি সংক্রমণের ঝুঁকি কমানো যায়।
তবে গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, কোনো ক্যানসার-সৃষ্টিকারী সংক্রমণ শরীরে পাওয়া গেলেই যে ওই ব্যক্তির ক্যানসার হবে, এমন নয়। দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণের পাশাপাশি বয়স, রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা, ধূমপান, জিনগত বৈশিষ্ট্যসহ বিভিন্ন কারণ একসঙ্গে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদান, প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্য পরীক্ষা, সময়মতো চিকিৎসা, নিরাপদ ইনজেকশন পদ্ধতি এবং যৌনস্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর মাধ্যমে সংক্রমণজনিত ক্যানসারের বড় একটি অংশ প্রতিরোধ করা সম্ভব।
গবেষকদের বার্তা হলো, ক্যানসার হওয়ার পর চিকিৎসার পাশাপাশি ক্যানসারের ঝুঁকি তৈরির আগেই সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে গুরুত্ব দিলে ভবিষ্যতে বিশ্বজুড়ে বিপুলসংখ্যক ক্যানসার প্রতিরোধ করা সম্ভব হতে পারে।

মন্তব্য করুন