
উচ্চ পাহাড়ি হাওয়া আর সবুজ প্রকৃতির মাঝে যেখানে একসময় মানুষ নিঃশ্বাস নিত নতুন জীবনের আশায়, সেখানে আজ বিরাজ করছে চরম অরাজকতা ও নিস্তব্ধতা। সীতাকুণ্ডের কুমিরা রেলস্টেশন সংলগ্ন পাহাড়ে অবস্থিত প্রায় শতবছরের ইতিহাস বিজড়িত ‘পুরাতন বক্ষব্যাধি হাসপাতাল (টিবি হাসপাতাল) ও স্যানেটোরিয়াম’ এখন ধ্বংসের শেষ প্রান্তে। সরকারের তদারকির অভাব আর দীর্ঘদিনের অবহেলায় ব্রিটিশ আমলের এই দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যটি পরিণত হয়েছে অপরাধীদের নিরাপদ অভয়ারণ্যে।
নিরাময় কেন্দ্র থেকে অপরাধের আস্তানা
স্থানীয় অধিবাসীদের অভিযোগ, একসময়ের জীবনদায়ী এই স্বাস্থ্যনিবাসটি এখন জঙ্গল আর লতাপাতায় ঢেকে গেছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় দিনদুপুরে কিংবা রাতের আঁধারে এখানে জমে উঠছে জুয়াড়ি, মাদকসেবী ও অসামাজিক চক্রের মেলা। চুরি হয়ে গেছে ভবনের মূল্যবান কাঠ, রড, ইট ও দরজা-জানালা। শুধু তাই নয়, রহস্যময় আবহের সুযোগ নিয়ে একশ্রেণির কনটেন্ট ক্রিয়েটর ও ইউটিউবার স্থানটিকে “ভৌতিক স্থান” বা “হান্টেড স্পট” হিসেবে প্রচার করে মূল ইতিহাসকে বিকৃত করছে।
”এটি কোনো ভৌতিক বাড়ি নয়, এটি আমাদের চিকিৎসা ও রেলওয়ে ইতিহাসের অনন্য দলিল। সরকারের অবহেলায় আজ এটি অপরাধীদের দখলে চলে গেছে।”
— ক্ষুব্ধ এক স্থানীয় বাসিন্দা
ইতিহাসের পাতা থেকে: সেকালের আধুনিক চিকিৎসাকেন্দ্র
ব্রিটিশ শাসনামলে আসাম-বেঙ্গল রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যক্ষ্মার চিকিৎসার উদ্দেশ্যে প্রায় ৩৯ একর পাহাড়ি জমির ওপর এই স্যানেটোরিয়ামটি নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। পাহাড়ের নির্মল বায়ুকে কাজে লাগিয়ে তৈরি এই হাসপাতালে ছিল:
আধুনিক চিকিৎসা সুবিধা: একাধিক দ্বিতল ভবন ও পৃথক চিকিৎসা কক্ষ।
চিকিৎসকদের আবাসন: চিকিৎসক ও কর্মীদের জন্য সুব্যবস্থিত আবাসন এলাকা।
চালু হওয়ার সাল: আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম চালু হয় ১৯৫৫ সালে।
তবে সময়ের ব্যবধানে যক্ষ্মার প্রকোপ কমে এলে ১৯৯২ সালে এই হাসপাতালের সব সরঞ্জাম ও কার্যক্রম সিআরবি রেলওয়ে হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। এরপর থেকেই মূল তালা ঝোলে এই ঐতিহাসিক ভবনে।
সংরক্ষণের সম্ভাবনা ও গণদাবি
ইতিহাসবিদ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, কুমিরা টিবি হাসপাতাল কেবল একটি পরিত্যক্ত ভবন নয়, এটি স্থাপত্যশৈলী ও চিকিৎসা বিজ্ঞানের এক দুর্লভ স্মারক। এটিকে যথাযথ সংস্কারের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্ভব:
ঐতিহ্যবাহী পর্যটন কেন্দ্র (Heritage Tourism): দৃষ্টিনন্দন প্রাকৃতিক পরিবেশের কারণে এটি চমৎকার পর্যটন কেন্দ্র হতে পারে।
গবেষণা ও শিক্ষা কেন্দ্র: পরিবেশ ও চিকিৎসা ইতিহাসের ওপর গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে।
বিনোদন ও পরিবেশবান্ধব পার্ক: স্থানীয়দের জন্য একটি পরিচ্ছন্ন বিনোদন ক্ষেত্র।
কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপের দাবি
ইতিহাসের এ অমূল্য স্মারক পুরোপুরি ধূলিসাৎ হওয়ার আগেই প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ রেলওয়ে ও স্থানীয় জেলা প্রশাসনের প্রতি আশু পদক্ষেপ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন সীতাকুণ্ডবাসী।
এলাকাবাসীর স্পষ্ট দাবি—অবিলম্বে এটিকে ‘সংরক্ষিত প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ’ হিসেবে ঘোষণা করে চত্বরে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে এবং সংস্কারের মাধ্যমে ফিরিয়ে দিতে হবে সীতাকুণ্ডের এই হারিয়ে যাওয়া সোনালী অতীত।
জাহাঙ্গীর আলম বিশেষ প্রতিনিধি
