
হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে কয়েক সপ্তাহের সামরিক উত্তেজনার পর আপাতত ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত কিছুটা প্রশমিত হওয়ার ইঙ্গিত মিলেছে। দুই পক্ষের মধ্যে নতুন করে কোনো হামলার খবর না থাকায় বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন দেখা গেছে। সোমবার এশিয়ার বাজারে লেনদেন শুরুর সঙ্গে সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৫ শতাংশের বেশি কমে ব্যারেলপ্রতি ৯১ দশমিক ৮৭ ডলারে নেমে আসে।
সাম্প্রতিক সংঘাতের সময় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরদার হওয়া এবং উত্তেজনা কমার খবরে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে, যার প্রভাব পড়েছে তেলের বাজারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে ইরানে হামলার পর আর কোনো নতুন বিমান অভিযান চালানো হয়নি। অন্যদিকে ইরানও শুক্রবারের পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোতে নতুন কোনো হামলা চালায়নি।
জাতিসংঘে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত মাইক ওয়াল্টজ জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার আগে কূটনৈতিক আলোচনাকে আরও কিছু সময় দিতে চান। বিশ্লেষকদের মতে, এই অবস্থানই বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিয়েছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে যুদ্ধ শুরুর আগে বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ পরিবহন করা হতো। তাই এ অঞ্চলে উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে।
তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, তেলের দাম আরও দ্রুত কমে যাবে—এমন আশা করার সুযোগ এখনই নেই। কারণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। একই সঙ্গে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে চলমান উত্তেজনা লোহিত সাগর দিয়ে জ্বালানি পরিবহনেও নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।
আরবিসি ক্যাপিটাল মার্কেটসের বৈশ্বিক পণ্যকৌশল বিভাগের প্রধান হেলিমা ক্রফট বলেন, সামরিক উত্তেজনা কিছুটা কমলেও হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল দ্রুত স্বাভাবিক হবে বলে মনে করার সুযোগ নেই। লোহিত সাগরের পরিস্থিতিও এখন বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এদিকে তেলের দাম বৃদ্ধি যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতেও প্রভাব ফেলেছে। জ্বালানির মূল্য বাড়ায় দেশটিতে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছেছে, যা ফেডারেল রিজার্ভের নির্ধারিত ২ শতাংশ লক্ষ্যমাত্রার দ্বিগুণেরও বেশি।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি গ্যালন পেট্রলের গড় মূল্য ৪ দশমিক ১১ ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা সংঘাত শুরুর আগের সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার বাড়ানো হবে কি না, তা নিয়ে আগামী বৈঠকে আলোচনা করবে ফেডারেল ওপেন মার্কেট কমিটি (এফওএমসি)।
অর্থনীতিবিদদের ধারণা, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ওপর চাপ বাড়ালেও আপাতত সুদের হার অপরিবর্তিত রাখার সম্ভাবনাই বেশি। তবে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও অস্থিতিশীল হয়ে উঠলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে নতুন করে চাপ তৈরি হতে পারে।
