
চট্টগ্রামে গ্যাসের সরবরাহ কমে যাওয়ায় নতুন করে সংকট দেখা দিয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় শিল্প, ক্যাপটিভ পাওয়ার (নিজস্ব বিদ্যুৎকেন্দ্র) এবং আবাসিক খাতে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দিয়েছে কর্ণফুলী গ্যাস বিতরণ কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল)। এর ফলে নগরের বিভিন্ন এলাকায় দিনের দীর্ঘ সময় চুলায় গ্যাসের চাপ থাকছে না, কোথাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা গ্যাসই মিলছে না। একই সঙ্গে কম চাপের কারণে উৎপাদন চালিয়ে যেতে হিমশিম খাচ্ছে শিল্পকারখানাগুলো।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, গত শুক্রবার সকাল ৮টা থেকে শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি মোট ২২ কোটি ৩০ লাখ ঘনফুট গ্যাস পেয়েছে। অথচ একই সময়ে চট্টগ্রামে গ্যাসের চাহিদা ছিল প্রায় ৩৫ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ১২ কোটি ৭০ লাখ ঘনফুট কম গ্যাস সরবরাহ পাওয়া গেছে। ফলে চাহিদার মাত্র ৬৪ থেকে ৭০ শতাংশ গ্যাস দিয়েই পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে।
গ্যাস সংকটের মূল কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কক্সবাজারের মহেশখালীতে থাকা ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি অচল হয়ে পড়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। গত মঙ্গলবার মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সিলারেট এনার্জি পরিচালিত এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামে, যেখানে গ্যাস সরবরাহ মূলত মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের ওপর নির্ভরশীল।
সংকট মোকাবিলায় শিল্প ও ক্যাপটিভ পাওয়ারে গ্যাসের চাপ কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। কেজিডিসিএলের এক কর্মকর্তা জানান, প্রতিদিন ২৫ থেকে ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হতো। কিন্তু বর্তমানে ২২ থেকে ২৩ কোটি ঘনফুটের বেশি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। টার্মিনাল পুনরায় চালু হলে সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এদিকে গ্যাসের স্বল্পচাপের সবচেয়ে বড় ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকরা। নগরের বিভিন্ন এলাকায় দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত গ্যাস না থাকায় রান্না করতে পারছেন না বাসিন্দারা। কোথাও আবার এতটাই কম চাপ থাকছে যে চুলা জ্বললেও প্রয়োজনীয় রান্না করা সম্ভব হচ্ছে না।
নগরের বহদ্দারহাট এলাকার বাসিন্দা উম্মে সাদিয়া জানান, কয়েক দিন ধরেই তাদের বাসায় গ্যাসের চাপ কম ছিল। গত বুধবার দুপুরের পর গ্যাস পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সন্ধ্যার পর সরবরাহ এলেও চাপ এত কম ছিল যে রান্না করা সম্ভব হয়নি। এরপর থেকে প্রতিদিনই একই সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। এতে রান্না, শিশুদের খাবার প্রস্তুত এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
কেজিডিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সালাহউদ্দিন বলেন, মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনাল থেকে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে তারা সার্বক্ষণিক কাজ করছেন।
রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, অগ্নিকাণ্ডের আগে মহেশখালীর দুটি ভাসমান টার্মিনাল থেকে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট এলএনজি জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা হতো। তবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর সেই সরবরাহ প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চট্টগ্রামের গ্যাস বরাদ্দে।
আরপিজিসিএলের মহাব্যবস্থাপক মো. শফিকুল ইসলাম জানান, টার্মিনালের কারিগরি ত্রুটি দ্রুত মেরামতের জন্য দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা কাজ করছেন। যত দ্রুত সম্ভব টার্মিনাল চালু করার চেষ্টা চলছে।
কেজিডিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চট্টগ্রামে মোট গ্যাস গ্রাহক রয়েছেন ১ লাখ ৪৬ হাজার ১৭৪ জন। এর মধ্যে ২০৪টি ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং ৯৬২টি শিল্পগ্রাহক রয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্র, সার কারখানা, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান ও বিপুলসংখ্যক আবাসিক গ্রাহক এই সরবরাহের ওপর নির্ভরশীল।
কেজিডিসিএলের মহাব্যবস্থাপক মু. রইস উদ্দিন আহমেদ বলেন, এলএনজি টার্মিনাল বন্ধ থাকায় গ্যাস সংকট আরও বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে শিকলবাহা বিদ্যুৎকেন্দ্র, কাফকো সার কারখানাসহ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোকে গ্যাসের ব্যবহার কমানোর অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, মহেশখালীর অচল এলএনজি টার্মিনাল দ্রুত চালু না হলে চট্টগ্রামে আবাসিক ভোগান্তির পাশাপাশি শিল্প উৎপাদন ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদনেও বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
