চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনা ও আধুনিকায়নে বৈশ্বিক বন্দর পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের চুক্তি করেছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ। চুক্তি অনুযায়ী, টার্মিনালটির আধুনিকায়নে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

বৃহস্পতিবার ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল এস. এম. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে সই করেন।

চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রাথমিকভাবে ১৫ বছর এনসিটি পরিচালনা করবে। তবে টার্মিনালের জমি, মূল অবকাঠামো ও সম্পদের মালিকানা চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছেই থাকবে। অর্থাৎ টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়া হলেও এর মালিকানা বা সার্বভৌম কর্তৃত্ব হস্তান্তর হচ্ছে না।

চুক্তির আওতায় ডিপি ওয়ার্ল্ডকে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা এককালীন অর্থ দিতে হবে। এর ২৫ শতাংশ চুক্তি সইয়ের সময় এবং বাকি ৭৫ শতাংশ কার্যক্রম শুরুর আগে পরিশোধ করার কথা রয়েছে। পাশাপাশি নতুন যন্ত্রপাতি, প্রযুক্তি ও আধুনিক পরিচালন ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে এনসিটির সক্ষমতা বাড়াতে প্রথম ১০ বছরে ১ হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে প্রতিষ্ঠানটি।

চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ টার্মিনালের আয় বা রয়্যালটির একটি অংশ পাবে। গড় টার্মিনাল আয়ের ওপর ভিত্তি করে প্রতি কনটেইনারে এই অংশ প্রায় ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে। এর বাইরে বছরে প্রায় ১০ কোটি টাকা নির্দিষ্ট ফি দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।

চুক্তিতে বছরে ন্যূনতম ১২ লাখ ৩০ হাজার টিইইউ কনটেইনার পরিচালনার নিশ্চয়তা রাখা হয়েছে। তবে নতুন কোনো টার্মিনাল চালু হলে এই ন্যূনতম পরিমাণ ১০ লাখ টিইইউতে নামিয়ে আনার সুযোগ থাকবে।

নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেন, আধুনিক যন্ত্রপাতি, ডিজিটাল ব্যবস্থা ও আন্তর্জাতিক মানের পরিচালন পদ্ধতি যুক্ত হলে এনসিটির দক্ষতা ও প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে। বিভিন্ন টার্মিনালে আন্তর্জাতিক পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান যুক্ত করার মাধ্যমে সেবার মান ও সরবরাহব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানো সরকারের বৃহত্তর নীতির অংশ বলেও জানান তিনি।

ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান ইসা কাজিম বলেন, এই অংশীদারত্বের মাধ্যমে এনসিটিকে প্রতিষ্ঠানটির বৈশ্বিক বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ আরও সহজ হবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।

চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ বর্তমানে এনসিটির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। দেশের বৈদেশিক বাণিজ্যের প্রায় ৯২ শতাংশ চট্টগ্রাম বন্দরনির্ভর। তবে কনটেইনার ও জাহাজের অবস্থানকাল এবং সামগ্রিক উৎপাদনশীলতার ক্ষেত্রে বন্দরটি এখনও নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে।

২০২৫ সালের কনটেইনার পোর্ট পারফরম্যান্স সূচকে বিশ্বের ৪০০টি কনটেইনার বন্দরের মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের অবস্থান ছিল ৩৬৪তম। সরকারের হিসাবে, পরিচালনগত অদক্ষতা ও আধুনিকায়নের ঘাটতির কারণে অর্থনীতিতে বছরে ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতি হচ্ছে।

নতুন চুক্তিতে সেবার মান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন কর্মদক্ষতা সূচক, নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ব্যর্থতার ক্ষেত্রে আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। টার্মিনালের কার্যক্রম তদারকি, নিরীক্ষা ও নিয়মিত প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের অধীনেই থাকবে।

চুক্তিতে নিরাপত্তা, শুল্ক, অভিবাসন, সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সংরক্ষণের বিষয়েও সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা হয়েছে। স্থানীয় কর্মসংস্থান অব্যাহত রাখার পাশাপাশি আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বাংলাদেশি কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির প্রত্যাশা করা হচ্ছে।

সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের আওতায় দীর্ঘ যাচাই-বাছাই ও মূল্যায়ন প্রক্রিয়ার পর ডিপি ওয়ার্ল্ডকে এনসিটি পরিচালনার জন্য নির্বাচন করা হয়। ২০২৩ সালে প্রক্রিয়াটি শুরু হয়ে ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর অর্থনৈতিক বিষয়সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির অনুমোদনের পর চুক্তি সই হলো।

চট্টগ্রাম বন্দরের নতুন লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনালের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গেও এনসিটির এই উদ্যোগ সমন্বয় করে এগিয়ে নেওয়া হবে। লালদিয়া টার্মিনাল ২০৩০ সালের মধ্যে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।