
যে হাটের ইজারামূল্য ছিল কোটি টাকার ওপরে, সেই হাট চার বছর ধরে ইজারা হয় না। সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে আয়ের ক্ষুদ্র অংশ রাজস্ব হিসেবে সরকারি কোষাগারে জমা হলেও বড় অংশই চলে যাচ্ছে সিন্ডিকেটের পেটে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে ভূমি কর্মকর্তার খাস কালেকশন করার কথা থাকলেও হাটে ‘খাস’ কালেকশন করেন আওয়ামী লীগ নেতারা। হাট থেকে আয়ের কিছু অংশ নায়েবকে দিয়ে বাকি অংশ তাদের মাঝে ১২০ ভাগ করে বাটোয়ারা হয়। এ চিত্র ঈশ্বরগঞ্জের আঠারবাড়ীর রায়েরবাজার গো’হাটার।
উপজেলার ১১ ইউনিয়নের প্রশাসনের ক্যালেন্ডারভুক্ত হাটবাজার রয়েছে ৪১টি। প্রতিবছর বাংলা সন হিসেবে এসব হাটবাজার ইজারা দেওয়া হয়। ইজারা হওয়ার পর হাটবাজার রক্ষণাবেক্ষণ ও উন্নয়নের জন্য ২০ শতাংশ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বাকি ৪৬ শতাংশ উন্নয়ন ফান্ডে যায়। ২০২১ সালে ৪১টি হাটের মধ্যে ইজারা হয়নি ছয়টি। এর মধ্যে রয়েছে আঠারবাড়ী ইউনিয়নের রায়েরবাজার গো’হাটা ও খালবলা বাজার। অন্য চারটি হলো- চাপিলাকান্দা নাপিতের বাজার, চরপাড়া গো’হাটা, সাখুয়া গো’হাটা ও পলাশকান্দা গো’হাটা।
উপজেলা প্রশাসনের তথ্য বলছে, রায়েরবাজার গো’হাটা সর্বশেষ বাংলা ১৪২৪ সনে (২০১৭) ইজারা হয়েছিল। এক কোটি ২৭ লাখ পাঁচ হাজার টাকা ইজারামূল্যের বাজারটি ছিল উপজেলার সর্বোচ্চ ইজারার। কিন্তু ২০১৮ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বৃহৎ বাজারটি ইজারা হচ্ছে না। আর খালবলা বাজার ইজারা হয়েছিল ২০১৯ সালে দুই লাখ ২৭ হাজার ৫২০ টাকায়। এর পর গত দু’বছর আর ইজারা হয়নি। ইজারাবিহীন বাজারগুলোতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে খাস কালেকশন করা হচ্ছে। ইজারা না হওয়ায় রায়েরবাজার গো’হাটার ইজারামূল্য কমে দাঁড়িয়েছে ৩৮ লাখ ১৪ হাজার ৯৯০ টাকা। এটি ২০২১ সালের ইজারা বিজ্ঞপ্তিতে উল্লিখিত। হাট ইজারা নিয়ে টাকা পরিশোধ না করায় গত ২০২১ সালে লক্ষ্মীগঞ্জ বাজার, সুটিয়া বাজার ও মহেশপুর বাজারে ইজারাদারের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসন টাকা আদায়ের জন্য সার্টিফিকেট মামলা করলেও রায়েরবাজার গো’হাটার বিষয়ে তাদের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই।
যে বাজারের ইজারামূল্য ছিল কোটি টাকা, সেই বাজার ইজারা না হওয়ার পেছনের কারণ অনুসন্ধান করেছে গণমাধ্যম। কোনো হাট ইজারা না হলে সরকারিভাবে ‘খাস’ কালেকশন করার জন্য খাস আদায় কমিটি করা হয়। সেই কমিটির মাধ্যমে খাস কালেকশন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তাকে দিয়ে খাস কালেকশন করিয়ে থাকেন। কিন্তু রায়েরবাজার গো’হাটায় খাস কালেকশন হচ্ছে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের মাধ্যমে। এটি চার বছর ধরেই চলে আসছে। প্রয়াত ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনের সময় থেকে এমনটি চলে আসছে। একই ধারা অব্যাহত রেখেছেন আওয়ামী লীগের বর্তমান চেয়ারম্যান জুবের আলম কবীর রূপকও।
চার বছর ইজারা না হওয়া রায়েরবাজার গো’হাটায় কত টাকা খাস কালেকশন হয়েছে, তা বের করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু ২০২০ সালের জুন মাসের আগের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে খাস আদায়ের রেজিস্টার থেকে পাওয়া তথ্য বলছে- ২০২০ সালের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত হাট থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের পরিমাণ ১০ লাখ ৩৩ হাজার টাকা। ২০২১ সালের জানুয়ারি থেকে অক্টোবর পর্যন্ত ১০ মাসে সংগ্রহ হয় ১১ লাখ ৭৮ হাজার ৯০০ টাকা। এই হিসাব উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে সংরক্ষিত থাকলেও রেজিস্টার খাতায় আর কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে সূত্র বলছে, খাস আদায় হওয়ায় কোটি টাকার হাটটিতে সরকারের রাজস্ব বছরে গড়ে ১৫ লাখ টাকা ছাড়ায় না।
প্রতি শুক্রবার রায়েরবাজার গো’হাট জমে। নান্দাইল ও কেন্দুয়ার সীমান্তবর্তী হাটটিতে তিন উপজেলার মানুষ গরু নিয়ে যান। তবে সিন্ডিকেটের কারণে হাটে কমতে শুরু করেছে পশুর আগমন। বর্তমানে হাট নিয়ন্ত্রণে রয়েছেন ইউপি চেয়ারম্যান জুবের আলম কবীর রূপক। তিনি আড়ালে থাকলেও প্রকাশ্যে রয়েছেন উপজেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আবদুর রহিম ভূঁইয়া, আঠারবাড়ী ইউনিয়নের কোষাধ্যক্ষ বিপুল সরকার টলন, আইনবিষয়ক সম্পাদক আবুল কাশেম। গত শুক্রবার হাটে তিন নেতাকেই খাস কালেকশন করতে দেখা যায়। তারা ছাড়াও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের প্রয়াত সভাপতি আমীর উদ্দিন ভূঁইয়ার ছেলে মোজাম্মেল হোসেন, ইউপি চেয়ারম্যান রূপকের মামা মানিক মিয়াকেও কালেকশন করতে দেখা যায় টেবিল পেতে। ছিলেন না ভূমি অফিসের কোনো কর্মকর্তা।
চার মাস ধরে বাজারটি আবদুর রহিম ভূঁইয়া, বিপুল সরকার টলন ও আবুল কাশেমের নিয়ন্ত্রণে। নায়েবের সঙ্গে মাসে ৪৫ হাজার টাকা চুক্তি করে বাজারে ‘খাস’ কালেকশন করেন তারা। সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেনের মৃত্যুর কিছুদিন আগে থেকে বাজারে যুক্ত হন আবদুর রহিম। তিনি জানান, চার মাস ধরে চুক্তি চলছে তাদের সঙ্গে। মাসে ৪৫ হাজার টাকা নায়েবকে দিয়ে বাজারটি তারা নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন। এই ব্যবস্থাটি করে দিয়েছেন সরিষা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহজাহান ভূঁইয়া। তিনি বলেন, বাজারটি যখন এক কোটি ২৭ লাখ টাকা হয়ে যায়, তখন সিন্ডিকেটের অনেক ক্ষতি হয়। সেই সময় থেকে খাস কালেকশন হয়ে আসছে।
আবদুর রহিম ভূঁইয়া বলেন, এই সিন্ডিকেটে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠন জড়িত। বাজার থেকে আসা প্রতি এক টাকা লভ্যাংশের ১৮ পয়সা (শতাংশ) নেন বর্তমান চেয়ারম্যান রূপক। তিনি (আবদুর রহিম), টলন ও কাশেম মিলে নেন সাত পয়সা, ছাত্রলীগ-যুবলীগ চার পয়সা করে, শ্রমিক লীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগ এক পয়সা করে। তবে ১০০ পয়সার বাজার হলেও বণ্টন হয় ১২০ পয়সা। চেয়ারম্যানের ১৮ পয়সা শেয়ার হলেও সেই টাকা নিজে না নিয়ে তার লোকজনকে দিয়ে দেন। চেয়ারম্যানের মামা মানিক ও হুমায়ুন পায় দুই পয়সা শেয়ার।
সহযোগী সংগঠনকে দিতে গিয়ে বণ্টন বেড়ে গেছে জানিয়ে আবদুর রহিম আরও বলেন, এখানে আরও অনেক সিন্ডিকেট টাকা পায়। আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত সবাই টাকা পায় এই হাট থেকে। ওয়ার্ড পর্যায়ের সভাপতি-সম্পাদকরাও টাকা পান। প্রতি মাসের শেষে হিসাব হয়ে টাকা ভাগাভাগি করেন তারা। হাটবারে ভূমি অফিসের দু-একজন আসেন। তাদের প্রতি বাজারে জনপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ করে টাকা দেন। আর মাস শেষে চুক্তির টাকা তুলে দেন নায়েবকে।
স্থানীয়দের সঙ্গে আলাপে জানা গেছে, হাট ইজারা নেওয়ার জন্য যারা শিডিউল কেনেন, তারাও ভাগ পান হাট থেকে। ইজারা নিলে সরকারকে আগেই পুঁজির টাকা দিয়ে দিতে হয়। কিন্তু এখন পুঁজি না খাটিয়ে মাস শেষে ভাগ পাচ্ছে সবাই। সে কারণে বাজারটি ইজারা হোক তা কেউ চায় না। আর এসব সিন্ডিকেটের কারণে হাটে পশুর আগমনও কমে গেছে।
আঠারবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জুবের আলম কবীর রূপক বলেন, নায়েব-আমি দু’জনে মিলে খাস কালেকশন করছি। অফিসিয়াল লোকজন মেলানো না যাওয়ায় তিনি সাপোর্ট দিচ্ছেন। কিন্তু দলীয় নেতাকর্মী কালেকশন করছেন কীভাবে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নায়েব হয়তো কোথাও গেছেন। বাজারটি সিস্টেমের মধ্যে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে, অন্য কেউ আগ্রহী না হলে তিনি নিজে এবার ইজারা নিতে ইচ্ছা প্রকাশ করেন। প্রতি বাজারে ৩৫ হাজার টাকার মতো কালেকশন হয় জানিয়ে তিনি বলেন, মাসে লাখ টাকার মতো খরচ রয়েছে। আশপাশের অবৈধ বাজারগুলো না ভাঙতে পারলে আঠারবাড়ী বাজার আর জমবে না। তবে খাসে আর মজা নেই। ভূমি অফিসের লোকজন কালেকশন করলে বাজার আরও শেষ হয়ে যাবে।
আঠারবাড়ী ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) হেলাল উদ্দিন আড়াই মাস আগে যোগ দিয়েছেন ইউনিয়নটিতে। বাজারে খাস কালেকশন তার তত্ত্বাবধানে হওয়ার কথা থাকলেও কালেকশন হয় আওয়ামী লীগ নেতাদের উপস্থিতিতে। স্থানীয় ভূমি অফিসের কোনো লোক থাকেন না হাটে। অথচ হাট থেকে ওঠা রাজস্ব জমা হওয়ার কথা সরকারি কোষাগারে।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) হেলাল উদ্দিন বলেন, ইউএনওকে জানিয়ে আগে যেভাবে হচ্ছিল সেভাবেই কালেকশন হচ্ছে। তারাই কালেকশন করেন এমন কথা জানিয়ে তিনি বলেন, তার অফিসের কেউ যায়, আমি যাই না। চেয়ারম্যান তাদের নিয়ে টাকাটা তুলে দেন। দায়িত্ব থাকলেও আওয়ামী লীগের লোকজন টাকা তোলে কীভাবে- এমন প্রশ্নে তিনি জানান, যেভাবে চলে আসছিল সেভাবেই হচ্ছে। এর বাইরে জানতে ইউএনওর সঙ্গে কথা বলতে বলেন তিনি।
ইউএনও হাফিজা জেসমিন বলেন, তিনি জানতেন বাজারটিতে খাস কালেকশন হয়। সিন্ডিকেটের বিষয়টি তার জানা ছিল না। কেউ অভিযোগও করেনি। তবে বাজারটি যেন ইজারা হয় এবার সব পক্ষকে নিয়ে বসে সেই ব্যবস্থা করবেন। খাস কালেকশনে যা রাজস্ব আদায় হয়, পুরোটা সরকারি কোষাগারে জমা হবে। রায়েরবাজার গো’হাটায় কী প্রক্রিয়ায় হচ্ছে, সেটি তিনি খোঁজ নেবেন।
