রংপুরসহ দেশের উত্তরাঞ্চলে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশা, হিমেল বাতাস ও সূর্যের অনুপস্থিতিতে জনজীবন কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। প্রচণ্ড শীতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছেন শিশু, বয়স্ক ও নিম্নআয়ের মানুষ। শীতজনিত বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়ে গত দুই সপ্তাহে রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকালে দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায়-মাত্র ৮ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস। একই সময়ে রংপুরে ১১ দশমিক ৯, নীলফামারীর সৈয়দপুরে ৯, কুড়িগ্রামের রাজারহাটে ১০ দশমিক ৫, লালমনিরহাটে ১০ দশমিক ৫, নীলফামারীর ডিমলায় ৯, ঠাকুরগাঁওয়ে ৯ দশমিক ৫ এবং গাইবান্ধায় ৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। বাতাসে আর্দ্রতার মাত্রা বেশি থাকায় কুয়াশা কাটছে না, ফলে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়েও বেশি শীত অনুভূত হচ্ছে।

রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধাসহ পুরো উত্তরাঞ্চলে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। ভোর থেকে দুপুর পর্যন্ত সূর্যের দেখা না মেলায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি কষ্টে আছেন খেটে খাওয়া মানুষ, দিনমজুর, রিকশাচালক ও ছিন্নমূল জনগোষ্ঠী।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, নিহত ১৬ জনের মধ্যে ৭ জন বয়স্ক ও ৯ জন শিশু। শীত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে শ্বাসকষ্ট, নিউমোনিয়া, ব্রংকাইটিস, হাঁপানি, কোল্ড ডায়রিয়া ও হৃদরোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। শিশু ও মেডিসিন ওয়ার্ডে রোগীর চাপ এতটাই বেশি যে শয্যা সংকট দেখা দিয়েছে। অনেক রোগীকে বাধ্য হয়ে মেঝে কিংবা বারান্দায় শুয়ে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আশিকুর রহমান জানান, “গত দুই সপ্তাহে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৬ জন রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তবে শুধুমাত্র শীতের কারণেই মৃত্যু-এ কথা নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না। শীতকালে হাঁপানি, নিউমোনিয়া ও ব্রংকাইটিসের মতো রোগের প্রকোপ স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে যায়।”

তিনি আরও বলেন, “বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের বড় একটি অংশই শীতজনিত রোগে আক্রান্ত। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যায়। তাই শিশুদের গরম কাপড় পরানো, কুসুম গরম পানি পান করানো এবং অপ্রয়োজনে বাইরে না বের হওয়ার পরামর্শ দিচ্ছি।”

এদিকে রংপুর আবহাওয়া অফিসের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আবহাওয়াবিদ মোস্তাফিজার রহমান জানান, ডিসেম্বর মাসে এ অঞ্চলে আট দিন এবং জানুয়ারিতে ইতোমধ্যে পাঁচ দিন সূর্যের দেখা মেলেনি। জানুয়ারি মাসে আরও দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে বলেও আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।

পরিস্থিতি বিবেচনায় দ্রুত শীতার্ত মানুষের পাশে দাঁড়াতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ জোরদারের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। বিশেষ করে ছিন্নমূল ও অসহায় মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শীতবস্ত্র বিতরণ এবং হাসপাতালগুলোতে বাড়তি চিকিৎসা সুবিধা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।