জমিজমা নিয়ে বিরোধ, আধিপত্য বিস্তার, মাছ ধরা, ফুটবল খেলা কিংবা সামান্য কথাকাটাকাটি—এমন তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বারবার রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার মানুষ। ছোটখাটো বিরোধ মুহূর্তেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। সংঘর্ষে ভাঙচুর, লুটপাট ও ঘরবাড়ি-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলার পাশাপাশি ঝরে যাচ্ছে প্রাণ। আহত হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন অনেকে। এতে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়ছে সামাজিক অস্থিরতা ও নিরাপত্তাহীনতা।

সাম্প্রতিক সময়ে বানিয়াচং উপজেলার মন্দুরী ও কাটকাল গ্রামে সংঘর্ষে দুজন নিহত হওয়ার ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। একই উপজেলায় এক সপ্তাহের ব্যবধানে চারজনের প্রাণহানির তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে সামনে এনেছে। এসব ঘটনায় অর্ধশতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।

তুচ্ছ বিরোধের জেরে একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—কেন এত সহজেই সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন মানুষ? সামাজিক বিরোধ মীমাংসার পরিবর্তে কেন সহিংসতার পথ বেছে নেওয়া হচ্ছে? এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের উপায়ই বা কী?

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে হবিগঞ্জ জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে ৯৫টি। এসব ঘটনায় আহত হন ১ হাজার ১৯৯ জন এবং নিহত হন ১৯ জন।

অন্যদিকে, ২০২৬ সালের প্রথম ১০ মাসে জেলায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে ১০৬টি। এসব ঘটনায় আহত হয়েছেন ৮৬০ জন এবং নিহত হয়েছেন ২৩ জন।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত বছরের পুরো সময়ের তুলনায় চলতি বছরের প্রথম ১০ মাসেই সংঘর্ষের ঘটনা বেড়েছে ১১টি। একই সময়ে প্রাণহানির সংখ্যা ১৯ থেকে বেড়ে ২৩ হয়েছে। অর্থাৎ, সংঘর্ষের সংখ্যা ও প্রাণহানি—দুই ক্ষেত্রেই পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। আহতের সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কম হলেও সংঘর্ষ ও প্রাণহানি বৃদ্ধি জেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

হবিগঞ্জের বিভিন্ন উপজেলার গ্রামাঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা গোষ্ঠীগত বিরোধ অনেক সময় নতুন কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে রূপ নেয়। জমির সীমানা নির্ধারণ, জমির দখল, মাছ ধরা, খেলাধুলা কিংবা ব্যক্তিগত কথাকাটাকাটি থেকে বিরোধের সূত্রপাত হয়। একপর্যায়ে এতে যুক্ত হন আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী ও নিজ নিজ পক্ষের লোকজন। পরে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন দুই পক্ষের লোকজন।

ছোট একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ দ্রুত আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। সংঘর্ষের সময় ভাঙচুর করা হয় বাড়িঘর ও দোকানপাট। কোথাও কোথাও লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। এতে বিরোধে সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হন সাধারণ মানুষও। অনেক পরিবার হারায় তাদের উপার্জনক্ষম সদস্য। আবার কেউ কেউ আহত হয়ে দীর্ঘদিন চিকিৎসাধীন থাকেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, আগে গ্রামাঞ্চলে কোনো বিরোধ দেখা দিলে মুরব্বি, জনপ্রতিনিধি ও গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সালিশ-বৈঠকের মাধ্যমে তা মীমাংসার চেষ্টা করতেন। এতে অনেক বিরোধ বড় সংঘর্ষে রূপ নেওয়ার আগেই থেমে যেত। কিন্তু বর্তমানে সামাজিক সালিশ ও পারস্পরিক সমঝোতার উদ্যোগ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে। ফলে ছোটখাটো বিরোধও দ্রুত বড় আকার ধারণ করছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় সংঘর্ষের পেছনে দীর্ঘদিনের গোষ্ঠীগত বিরোধ, সামাজিক প্রভাব বিস্তার এবং আধিপত্য ধরে রাখার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক কোনো ঘটনাকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ শুরু হলেও এর পেছনে থাকে পুরোনো বিরোধ ও প্রতিশোধের মনোভাব।

এক পক্ষের সঙ্গে অন্য পক্ষের বিরোধ দেখা দিলে ব্যক্তিগত সমস্যাও অনেক সময় গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্বে রূপ নেয়। ফলে বিরোধ মীমাংসার পরিবর্তে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। আগের ঘটনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে নতুন সংঘর্ষের সৃষ্টি হয়। এভাবে একই এলাকায় বারবার সংঘর্ষের ঘটনা ঘটতে থাকে।

হবিগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট মঞ্জুর উদ্দিন আহমেদ শাহীন মনে করেন, এসব সংঘর্ষের কারণ ও প্রতিকার নির্ধারণে সামাজিক বিরোধ, গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং আইনগত বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। ছোট বিরোধ যাতে সহিংসতায় রূপ নিতে না পারে, সে জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া জরুরি।

জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ জেলায় জনসংখ্যা প্রায় ২৩ লাখ ৫৮ হাজার ৮৮৬ জন। অন্যদিকে, জেলার প্রায় ১ লাখ ৮৭ হাজার কিশোর-কিশোরী ও তরুণ-তরুণীর মধ্যে ৩৯ দশমিক ১৪ শতাংশ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণের সঙ্গে সম্পৃক্ত নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে এসব তথ্যের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনার সরাসরি সম্পর্ক নির্ধারণে আরও বিশ্লেষণ প্রয়োজন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, তরুণদের গঠনমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিরোধ মীমাংসার কার্যকর ব্যবস্থা জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার তারেক মাহমুদ বলেন, “যারা এমন ঘটনা ঘটাচ্ছে, আমরা তাদের চিহ্নিত করছি এবং আইনের আওতায় আনার চেষ্টা করছি। হবিগঞ্জ একটি হাওর এলাকা। বেশির ভাগ ঘটনাই ঘটছে গ্রামীণ এলাকায়। তুচ্ছ বিষয় থেকে যাতে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা না ঘটে, আমরা সেদিকে গুরুত্ব দিচ্ছি।”

বারবার সংঘর্ষ ও প্রাণহানির এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, পুরোনো বিরোধের স্থায়ী সমাধান, স্থানীয় পর্যায়ে কার্যকর মধ্যস্থতা এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অন্যথায় সামান্য বিরোধ থেকেই প্রাণহানি ও সম্পদহানির ঘটনা অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।