ঢাকা
২৫ জুন ২০২৬

স্বাস্থ্য খাতের গোলকধাঁধা: সংকট ও নিষ্ফল চেষ্টার গল্প

বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিবেদক
বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন ২০২৬   ৩৪ বার পঠিত
স্বাস্থ্য খাতের গোলকধাঁধা: সংকট ও নিষ্ফল চেষ্টার গল্প

আধুনিক ব্যবস্থাপনার সাফল্য সংকট মোকাবিলায় নয়, বরং সংকট প্রতিরোধে নিহিত। একটি কার্যকর স্বাস্থ্যব্যবস্থা এমনভাবে পরিচালিত হয়, যেখানে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগেই শনাক্ত করা হয়, প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয় এবং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়, যাতে জনস্বাস্থ্য সংকটের উদ্ভবই না ঘটে অথবা ঘটলেও তার প্রভাব ন্যূনতম পর্যায়ে সীমাবদ্ধ থাকে। অর্থাৎ স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হওয়া উচিত পূর্বপ্রস্তুতি, নজরদারি ও প্রতিরোধভিত্তিক (প্রোঅ্যাকটিভ) ব্যবস্থা গ্রহণ।
কিন্তু বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা এখনো মূলত প্রতিক্রিয়াপ্রবণ (রিঅ্যাকটিভ)। আমরা সাধারণত তখনই সক্রিয় হই, যখন কোনো সমস্যা বড় আকার ধারণ করে, কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, কোনো রোগীর করুণ মৃত্যু গণমাধ্যমের শিরোনাম হয় অথবা কোনো স্বাস্থ্যপ্রতিষ্ঠানের অনিয়ম জনসমক্ষে আসে।
আমরা প্রায়ই স্বাস্থ্য খাতকে হাসপাতাল, চিকিৎসক ও ওষুধের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে দেখি। অথচ বাস্তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থা একটি বৃহৎ ও জটিল ইকোসিস্টেম (পরস্পর নির্ভরশীল ব্যবস্থা)। এর মধ্যে রয়েছে চিকিৎসাশিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা প্রদান, জনস্বাস্থ্য, স্বাস্থ্য অর্থায়ন, ওষুধশিল্প, চিকিৎসা যন্ত্রপাতি, নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি, গবেষণা, তথ্যব্যবস্থা, সরবরাহব্যবস্থা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন। এ ব্যবস্থার প্রতিটি অংশ একে অপরের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পর্কযুক্ত।
বিগত দশকগুলোয় স্বাস্থ্য অবকাঠামোর ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটেছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে শতাধিক মেডিক্যাল কলেজ, অসংখ্য নার্সিং কলেজ, মেডিক্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট ট্রেনিং স্কুল, ইনস্টিটিউট অব হেলথ টেকনোলজি ও নানা ধরনের চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে। কিন্তু সংখ্যাগত সম্প্রসারণের সঙ্গে মানগত উন্নয়ন সমানতালে এগোয়নি। শিক্ষকসংকট, বিশেষ করে বেসিক মেডিক্যাল সায়েন্স ও প্যারাক্লিনিক্যাল বিষয়ে দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অপর্যাপ্ত ল্যাব–সুবিধা, দুর্বল ক্লিনিক্যাল প্রশিক্ষণ এবং যুগোপযোগী কারিকুলামের ঘাটতি দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। অনেক প্রতিষ্ঠানে পর্যাপ্ত শিক্ষক নেই, আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী নেই, এমনকি আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী প্রশিক্ষণের সুযোগও সীমিত।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, চিকিৎসাশিক্ষার মান নিশ্চিত করার জন্য এখনো শক্তিশালী মান যাচাইয়ের ব্যবস্থা কার্যকর হয়নি। অধিকাংশ উন্নত দেশে চিকিৎসাশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মান নিয়মিত মূল্যায়ন করা হয় এবং চিকিৎসকদের লাইসেন্সিং পরীক্ষার মাধ্যমে দক্ষতা যাচাই করা হয়। অথচ বাংলাদেশে এখনো এমন একটি ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা যায়নি। ফলে বিভিন্ন মানের প্রতিষ্ঠান থেকে স্নাতক হওয়া চিকিৎসকেরা একই পেশাগত স্বীকৃতি লাভ করছেন। রোগীর নিরাপত্তা এবং স্বাস্থ্যসেবার গুণগত মানের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি বড় নীতিগত দুর্বলতা।
শুধু চিকিৎসাশিক্ষা নয়, স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সমস্যা রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স, মিডওয়াইফ, মেডিক্যাল টেকনোলজিস্ট, বায়োমেডিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার এবং হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ—সব ক্ষেত্রেই দক্ষ মানবসম্পদের ঘাটতি রয়েছে। অনেক হাসপাতালের অবকাঠামো সম্প্রসারিত হলেও সেই অনুপাতে মানবসম্পদ নিয়োগ হয়নি। ফলে চিকিৎসক ও নার্সদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হচ্ছে, সেবার মান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কিন্তু সমস্যা শুধু জনবলের ঘাটতি নয়; সমস্যা জনবল পরিকল্পনা, বণ্টন ও দক্ষতা উন্নয়নেরও।
দেশের অনেক উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, জেলা হাসপাতালে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত জনবল নেই, আবার কোথাও জনবল থাকলেও তাদের দক্ষতা হালনাগাদ করার কার্যকর ব্যবস্থা নেই। চিকিৎসাবিজ্ঞান প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হচ্ছে, কিন্তু ‘কন্টিনিউয়িং প্রফেশনাল ডেভেলপমেন্ট’ বা ধারাবাহিক পেশাগত উন্নয়নের সংস্কৃতি এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। সহায়ক কর্মীদের তীব্র সংকট দীর্ঘদিন ধরেই বিদ্যমান। অন্যদিকে আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে সহায়ক কর্মী নিয়োগের ফলে হাসপাতালের নিরাপত্তা, জবাবদিহি, কর্মদক্ষতা ও সেবার ধারাবাহিকতা নিয়ে নানা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে।
হাসপাতালের সংকটগুলোর পেছনেও রয়েছে বহু অদৃশ্য কারণ। আমরা যখন কোনো হাসপাতালে যন্ত্রপাতি নষ্ট, ওষুধের সংকট কিংবা অবকাঠামোগত সমস্যার কথা শুনি, তখন সাধারণত হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে দায়ী করি। কিন্তু বাস্তবে হাসপাতালের কার্যকারিতা নির্ভর করে বহু প্রতিষ্ঠানের ওপর। স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর, গণপূর্ত অধিদপ্তর, কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগার (সিএমএসডি), এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল), জাতীয় চিকিৎসা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণ কর্মশালা ও প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং অন্যান্য সহায়ক প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা প্রায়ই সেবাদানে বিঘ্ন সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশের ওষুধশিল্প আন্তর্জাতিকভাবে একটি সাফল্যের গল্প হিসেবে বিবেচিত হলেও কাঁচামালের আমদানিনির্ভরতা, গবেষণা ও উন্নয়নে সীমিত বিনিয়োগ এবং উৎপাদন–বৈচিত্র্যের ঘাটতি এখনো বড় চ্যালেঞ্জ। একইভাবে চিকিৎসা যন্ত্রপাতির শিল্প এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। ফলে বৈশ্বিক সরবরাহশৃঙ্খলে কোনো বিঘ্ন ঘটলে স্বাস্থ্য খাত ঝুঁকির মুখে পড়ে।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা হলো স্বাস্থ্য অর্থায়ন। সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা অর্জনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে স্বাস্থ্য অর্থায়নের কাঠামোগত সংস্কার অনিবার্য। ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে করভিত্তিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা, কৌশলগত ক্রয় ও ঝুঁকি ভাগাভাগির বিধান রেখে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) ব্যবস্থা ছাড়া জনগণকে আর্থিক সুরক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়।
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি বড় সমস্যা হলো নীতি প্রণয়ন, নিয়ন্ত্রণ, অর্থায়ন ও সেবা প্রদান—সবকিছু একই প্রশাসনিক কাঠামোর মধ্যে কেন্দ্রীভূত। বিশ্বের অনেক দেশে এসব কার্যক্রম পৃথক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিচালিত হয়, যাতে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত হয়। বাংলাদেশেও একটি শক্তিশালী ও স্বায়ত্তশাসিত জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন এখন আর বিলাসিতা নয়; বরং স্বাস্থ্য সংস্কারের পূর্বশর্ত।
স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্য খাতের গভীরতর সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে স্বাস্থ্যব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ, নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালীকরণ, স্বাস্থ্য অর্থায়ন
সংস্কার, জাতীয় স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠা, গুণগত মান নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় মৌলিক পরিবর্তন। কিন্তু এসব সুপারিশ বাস্তবায়নে রাজনৈতিক অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অপরিহার্য।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতকে আজ ছিদ্রযুক্ত একটি জাহাজের সঙ্গে তুলনা করা যায়। বিভিন্ন দিক থেকে অসংখ্য ছিদ্র দিয়ে পানি প্রবেশ করছে। এ অবস্থায় একজন বিচক্ষণ ক্যাপ্টেনের কাজ কেবল বালতি দিয়ে পানি ফেলে দেওয়া নয়; বরং কোথায় সবচেয়ে বড় ছিদ্র রয়েছে, তা চিহ্নিত করে সেটি বন্ধ করা। কারণ, মূল ছিদ্র বন্ধ না করলে অন্য ছিদ্রগুলো সাময়িকভাবে সামাল দিলেও জাহাজকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।

স্বাস্থ্য খাতের বর্তমান সংকটও ঠিক তেমনি। বিচ্ছিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান, হাসপাতাল পরিদর্শন কিংবা কিছু প্রশাসনিক ব্যবস্থা হয়তো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু এগুলো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। যদি চিকিৎসাশিক্ষার মান, স্বাস্থ্য অর্থায়ন, মানবসম্পদ উন্নয়ন, নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি এবং স্বাস্থ্য সুরক্ষার কাঠামোগত দুর্বলতাগুলো সমাধান করা না যায়, তাহলে সংকট বারবার ফিরে আসবে।
কবি শামসুর রাহমানের ‘পণ্ডশ্রম’ কবিতার মতো আমরা যদি কেবল চিলের পেছনে ছুটতেই থাকি, তাহলে একসময় হয়তো দেখব সময় ফুরিয়ে গেছে, কিন্তু সমস্যার সমাধান হয়নি, যা অতীতে দেখা গেছে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে—আমরা কি সংকটের পেছনে ছুটে বেড়াব, নাকি এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলব, যেখানে সংকটের উৎপত্তিস্থলগুলোই ধীরে ধীরে নির্মূল হয়ে যাবে?
একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও জনমুখী স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তুলতে হলে এখনই প্রতিক্রিয়াপ্রবণতা থেকে প্রতিরোধভিত্তিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের পথে যাত্রা শুরু করতে হবে।
● ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, অ্যালায়েন্স ফর হেলথ রিফর্মস, বাংলাদেশ
Facebook Comments Box
আর্কাইভ ক্যালেণ্ডার
Su Mo Tu We Th Fr Sa