
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত বিএনপি সরকারের মন্ত্রিসভায় দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের অনেকে জায়গা পাননি।
বে তাদের কয়েকজনকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর পদমর্যাদায় উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
লে দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন নিয়ে বিএনপির তৃণমূলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ত্যাগ, নির্যাতন, কারাভোগ ও সাংগঠনিক অভিজ্ঞতার জন্য পরিচিত নেতাদের মধ্যে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, শামসুজ্জামান দুদু, জয়নুল আবদিন ফারুক, সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ও হাবিব-উন-নবী খান সোহেল উল্লেখযোগ্য।
গয়েশ্বর চন্দ্র রায়
বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রাজপথের আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। বিভিন্ন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেওয়ার পাশাপাশি পুলিশের হামলা ও টিয়ারশেলের মুখেও রাজপথে ছিলেন তিনি। ২০২৩ সালে পুরান ঢাকার ধোলাইখালে বিএনপির কর্মসূচিতে পুলিশের হামলায় আহত হন গয়েশ্বর।
ষাটের দশকে ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে রাজনীতিতে যুক্ত হওয়া গয়েশ্বর ১৯৭৮ সালে জিয়াউর রহমানের আহ্বানে বিএনপিতে যোগ দেন। পরে যুবদলের সাধারণ সম্পাদক, বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও স্থায়ী কমিটির সদস্য হন। ২০২৬ সালে প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি তিনি।
রুহুল কবির রিজভী
বিএনপির সংকটকালীন সময়ে নয়াপল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে থেকে নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন ও দলীয় কর্মসূচিতে সক্রিয় ছিলেন রুহুল কবির রিজভী। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে তার ভূমিকার পাশাপাশি মামলা ও কারাভোগের ঘটনাও রয়েছে।
তবে মন্ত্রিসভায় না থাকলেও রিজভীকে মন্ত্রী পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে তাকে ওই পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।
শামসুজ্জামান দুদু
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু দীর্ঘদিন ধরে দলীয় রাজনীতির পাশাপাশি গণমাধ্যম ও টকশোতে সক্রিয় ছিলেন। সরকারবিরোধী আন্দোলনে মাঠে থাকার পাশাপাশি বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার ও কারাভোগ করেছেন তিনি।
চুয়াডাঙ্গা-১ আসন থেকে প্রথমে মনোনয়ন না পাওয়ার পর সরকার গঠনের পর মন্ত্রিসভাতেও জায়গা হয়নি তার।
জয়নুল আবদিন ফারুক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ষষ্ঠবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন বিএনপির এই প্রবীণ নেতা। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ হিসেবে সরকারবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন তিনি।
সংসদ ভবনের সামনে পুলিশি হামলায় আহত হওয়ার ঘটনাটি তার রাজনৈতিক জীবনের আলোচিত অধ্যায়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও নির্যাতনের পরও মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়ায় তার অনুসারীদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।
এ বিষয়ে জয়নুল আবদিন ফারুক বলেন, বিএনপি বড় রাজনৈতিক দল হওয়ায় ত্যাগী নেতাকর্মীর সংখ্যা অনেক। সবাইকে একসঙ্গে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। প্রধানমন্ত্রী পর্যায়ক্রমে সবাইকে মূল্যায়ন করবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল
রাজপথের আন্দোলন ও গণমাধ্যমে বিএনপির অবস্থান তুলে ধরার ক্ষেত্রে পরিচিত মুখ সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল। সরকারবিরোধী আন্দোলনের সময় একাধিকবার গ্রেপ্তার ও কারাভোগ করেছেন তিনি। তার বিরুদ্ধে কয়েক শত মামলা থাকার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
মন্ত্রিসভায় জায়গা না পাওয়া নিয়ে হতাশ না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে আলাল বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দলের ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবেন। মিছিলের শেষ কর্মীটিও মূল্যায়ন পাবেন—প্রধানমন্ত্রীর এমন বক্তব্যের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
হাবিব-উন-নবী খান সোহেল
ঢাকা মহানগর বিএনপির রাজনীতিতে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন হাবিব-উন-নবী খান সোহেল। আন্দোলন-সংগ্রামের সময় তার বিরুদ্ধে বিপুলসংখ্যক মামলা হয়েছে এবং দীর্ঘ সময় আত্মগোপন ও কারাভোগ করতে হয়েছে বলে দলীয় সূত্রে জানা যায়।
২০১৮ সালে খালেদা জিয়ার কারাবরণের সময় ১৪৪ ধারা ভেঙে নেতাকর্মীদের নিয়ে বিক্ষোভের নেতৃত্ব দেন তিনি। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন না পাওয়ার পর মন্ত্রিসভাতেও জায়গা হয়নি তার।
আরও যারা আলোচনায়
রাজপথের পরিচিত নেতাদের মধ্যে সাইফুল আলম নীরব, ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আব্দুল কাদির ভূঁইয়া জুয়েল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক আকরামুল হাসান মিন্টু, ফজলুর রহমান খোকন, কাজী রওনকুল ইসলাম শ্রাবণ ও ইকবাল হোসেন শ্যামলও মনোনয়ন বা দলীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে তাদের অনুসারীদের দাবি।
তাদের অনেকেই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মামলা, হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখেও বিএনপির আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন।
ত্যাগীদের মূল্যায়নের দাবি
বিএনপির নেতাদের একটি অংশ মনে করছেন, দীর্ঘদিনের আন্দোলন-সংগ্রামে যারা ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাদের সাংগঠনিক ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা করতে পারেননি এবং দীর্ঘদিন কারাবরণ ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধাপে ধাপে ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়ন করবেন বলে বিশ্বাস করেন তিনি।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমানও ত্যাগী নেতাদের মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন। তার মতে, সাংগঠনিক দায়িত্ব, সরকারি বিভিন্ন নিয়োগ ও স্থানীয় নির্বাচনে মনোনয়নের মাধ্যমে তাদের মূল্যায়নের সুযোগ রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিরোধী দলে থাকাকালে যারা দীর্ঘদিন আন্দোলন ধরে রেখেছেন, ক্ষমতায় আসার পর তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হলে তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মধ্যে ইতিবাচক বার্তা যায়। তবে নতুন সরকারে নতুন মুখ ও কারিগরি দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়ার কারণে রাজপথের কয়েকজন পরীক্ষিত নেতার বাদ পড়া নিয়ে দলের ভেতরে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
তবে বিএনপির নেতাদের একটি অংশের আশা, সরকার গঠনের শুরুতেই সবাইকে মূল্যায়ন করা সম্ভব নয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দলের দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাদের আরও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনা হবে।
