করোনাকালীন সময়ে রংপুরে ভয়ঙ্কর আকার ধারণ করেছে ধর্ষন, যৌন নিপীড়ন ও নারী নির্যাতনের সংখ্যা। গত বছরের থেকে এ বছর মাত্র ৯ মাসেই ধর্ষনের সংখ্যা প্রায় দেড়গুন। ২০১৯ সালে ১০ মাসে ২৭৯ টি নারী নির্যাতন মামলা হলেও এবছর ৯ মাসেই নারী নির্যাতন ৩৭৯টি। জিআরও অফিস সুত্রে এসব তথ্য পাওয়া যায়।
রংপুরে সেপ্টেম্বর মাসে হারাগাছ থানাধীন হারাগাছ থানাধীন উত্তর ঠাকুরদাশ এলাকায় পিতা তইজার রহমান কর্তৃক ধর্ষিত হয় ১৩ বছরের নিজ কন্যা। এছাড়াও নগরীর গণেশপুর এলাকা থেকে একই ঘরে দুই বোনের লাশ উদ্ধার করা হয়। বড়বোনকে ধর্ষনের পর হত্যা আর ছোট বোনকে হত্যা করা হয় দেখে ফেলার জন্য। ২০২০ সালে এমন নরকীয় ঘটনা করোনা মহামারী ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণে অনেক বেশি বেড়ে গেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
জিআরও অফিস সুত্রে আরও জানা যায়, ২০২০ সালে জানুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত রংপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলা ও রংপুর মেট্রো পলিটন এলাকায় ধর্ষনের সংখ্য ১১৬টি। যেখানে ২০১৯ সালে ৯ মাসে এই সংখ্যা ছিল ৮০টি। এছাড়াও এবছর যৌনপীড়ন জন্য ৪৬টি, ধর্ষণের চেষ্টা ও মারধরের ঘটনায় ৩৭টি, অপহরণের ১০৪ টি ও যৌতুকের ৬৬টি নারী নির্যাতন মামলা নিবন্ধিত হয়েছে। এবছর ধর্ষনের ফলে গংগাচড়া, পীরগঞ্জ ও বদরগঞ্জ উপজেলায় ৩ জনের মৃত্যু হয়। এছাড়া যৌতুকের জন্য পীরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলায় ২ জনকে এবং রংপুর মেট্রো পলিটন এলাকায় ২ জনকে হত্যা করা হয়।
এনিয়ে উপÑপুলিশ কমিশনার(অপরাধ) আবু মারুফের সাথে কথা বলা হলে তিনি জানান, ‘করোনাকালীন সময়ে আমরা দেখতে পাচ্ছি পারিবারিক সহিংসতা, নারী নির্যাতন, সামাজিক অস্থিতিশীলতা অনেকটা বেড়ে গেছে। আগে কমিউনিটি পুলিশিং এর মাধ্যমে বিভিন্ন পাড়া মহল্লা অপরাধ প্রতিরোধের ব্যাপারে সভা করা হতো। এখন এটা সম্ভব হচ্ছেনা করোনার কারণে। নারী নির্যাতন প্রতিরোধের ব্যবস্থা আমাদের হাতে থাকেনা। আমরা খবর শোনা মাত্রই অপরাধী ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করি। নারী নির্যাতন প্রতিরোধে প্রশাণের সাথে সমাজ, পরিবার তথা নিজেকেও দায়িত্ব নিতে হবে।
এনিয়ে সুজনের রংপুর সভাপতি ফখরুল আনাম বেনজু বলেন, টিকটকের মাধ্যমে রাতারাতি সেলেব্রেটি হওয়ার প্রবণতা ও সেটার সহজলভ্যতা, ক্রাইম পেট্রোলের মাধ্যমে অপরাধ করা ও লুকানোর কারচুপি, সামাজিক অনুশাসন না থাকা, পারিবারিক সম্প্রিতী ও দায়িত্বহীনতাই এসব অপরাধ বাড়িয়ে তুলেছে। এছাড়াও আকাশ সংস্কৃতির অপব্যবহার ও যুবসমাজের কাছে পর্ণগ্রাফীর অবাধ ব্যবহার ধর্ষণের জন্য দায়ী। এখনই সময় এসব রুখে দাড়ানোর।
বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, রংপুর সভাপতি হাসনা বেগম বলেন, ‘আমাদের জাতীয় চেতনাকে ভুলে গিয়ে একদল অসৎ মানুষ যুব সমাজকে ভুল পথে চালনা করছে। তাই রাজনৈতিক ব্যানারে ধর্ষণ করার সাহস পাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলেও সামাজিক অনুশাসনের ভঙুরতা আর পর্ণগাফীর কারণে যৌণ নির্যাতন চলছে।’
জিআরও অফিস তথ্যমতে, রংপুর কোতয়ালী থানায় ২০২০ সালের জানুয়ারী থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত ধর্ষণের ৫টি, যৌন নিপীড়নের ৩টি ও ২টি জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ও একটি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
গংগাচড়া থানায় ধর্ষণের ৭টি, এদের মধ্যে ধর্ষনের ফলে একজনের মৃত্যু হয়, যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ৬টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৬টি, ১২ টি অপহরণ ও ৭টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
কাউনিয়া থানায় ধর্ষণের ৬টি, যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ৪টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টার ২টি, ৩ টি অপহরণ ও ৪টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
তারাগঞ্জ থানায় ধর্ষণের ৩টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৪টি, ৫ টি অপহরণ ও ১টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়। পীরগঞ্জ থানায় ধর্ষণের ১৭টি (এদের মধ্যে ধর্ষনের ফলে একজনের মৃত্যু হয়), গণধর্ষনের ১টি, যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ২টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ২টি, ৬ টি অপহরণ ও ১১টি যৌতুক ও নারী নির্যাতন মামলা (এদের মধ্যে একজনকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়) দায়ের করা হয়।
বদরগঞ্জ থানায় ধর্ষণের ১১টি (এদের মধ্যে ধর্ষনের ফলে একজনের মৃত্যু হয়), যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ৭টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৫টি, ২ টি অপহরণ ও ৬টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
পীরগাছা থানায় ধর্ষণের ৮টি (এদের মধ্যে ধর্ষনের ফলে একজনের গর্ভপাত ঘটানো হয়), যৌন নিপীড়নের ৪টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ২টি, ৫ টি অপহরণ ও ৮টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
মিঠাপুকুর থানায় ধর্ষণের ১৬টি, যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ৬টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৫টি, ১১ টি অপহরণ ও ১১টি যৌতুক মামলা (এদের মধ্যে একজনকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়) দায়ের করা হয়।
এছাড়াও রংপুর মেট্রো পলিটনে ধর্ষণের ২০টি, যৌন নিপীড়নের ও মারধরের ৯টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৬টি, ২২ টি অপহরণ ও ১৯টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়। এদের মধ্যে ২ জনকে যৌতুকের জন্য হত্যা করা হয়।
রংপুর মেট্রো পলিটনের আওতাধীন হারাগাছ থানায় ধর্ষণের ৫টি, যৌন নিপীড়নের ১টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৩টি, ৯ টি অপহরণ ও ৫টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
রংপুর মেট্রো পলিটনের আওতাধীন তাজহাট থানায় ধর্ষণের ৬টি, যৌন নিপীড়নের ১টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ১টি, ৫ টি অপহরণ ও ৪টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
রংপুর মেট্রো পলিটনের আওতাধীন হাজিরহাট থানায় ধর্ষণের ৬টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৫টি, ৫ টি অপহরণ ও ২টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
রংপুর মেট্রো পলিটনের আওতাধীন পরশুরাম থানায় ধর্ষণের ১টি, যৌন নিপীড়নের ১টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ৩টি, ৫ টি অপহরণ ও ২টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
রংপুর মেট্রো পলিটনের আওতাধীন মাহিগঞ্জ থানায় ধর্ষণের ৫টি, যৌন নিপীড়নের ২টি, জোরপূর্বক ধর্ষনের চেষ্টা ১টি, ৯ টি অপহরণ ও ২টি যৌতুক মামলা দায়ের করা হয়।
Development by: webnewsdesign.com