বাংলাদেশ সরকার ও বিশ্বব্যাংকের যৌথ অর্থায়নে প্রায় ১ কোটি ৭ লাখ টাকা খরচে নির্মিত হচ্ছে মাত্র ২৬৫ মিটারের একটি সড়ক। অথচ সেই সড়কের কাজ শেষ হতেই দেখা দিয়েছে তীব্র জনদুর্ভোগ ও চরম নিরাপত্তাঝুঁকি। ফেনী পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের গোলাপবাগ সড়কের এই উন্নয়নকাজে ধরা পড়েছে একের পর এক অনিয়ম,সমন্বয়হীনতা ও বৈষম্যের অভিযোগ। নকশা অনুযায়ী ১৩ ফুট চওড়া হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সড়কটির কোথাও প্রস্থ মাত্র ৮ ফুট, কোথাও ১২ ফুট, আর কোথাও ১৩ ফুট। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো—সড়কের ঠিক মাঝখানে ৬টি বিদ্যুতের খুঁটি অক্ষত রেখেই সম্পন্ন করা হয়েছে ঢালাইয়ের কাজ!
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, এলজিসিআরআরপি (LGCRRP) প্রকল্পের আওতায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে গোলাপবাগ সড়কের উন্নয়নকাজ হাতে নেওয়া হয়। কাজটির দায়িত্বে রয়েছে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দি নিউ ট্রেটলিং’। তবে কাজের শুরু থেকেই চরম সমন্বয়হীনতা ও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয়রা। বিদ্যুতের খুঁটিগুলো অপসারণের কোনো উদ্যোগ না নিয়েই তার ওপর ড্রেন ও ঢালাইয়ের কাজ শেষ করা হয়েছে। ফলে সড়কটি সচল হওয়ার আগেই তা এখন যানবাহন চলাচলের বড় প্রতিবন্ধকতায় পরিণত হয়েছে।
স্থানীয় কাতার ভবনের মালিক সিরাজ এবং ফাতেমা মঞ্জিলের মালিক মহিম ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, প্রাক্কলন অনুযায়ী সড়কের চওড়া ১৩ ফুট নির্ধারিত ছিল। কিন্তু মেপে দেখা গেছে, সড়কের বিভিন্ন স্থানে প্রস্থের ব্যাপক অসামঞ্জস্য রয়েছে।
এলাকাবাসীর গুরুতর অভিযোগ, সড়কের জায়গা নির্ধারণে চরম বৈষম্য করা হয়েছে। প্রভাবশালীদের স্থাপনা রক্ষা করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়েছে, যার ফলে সেসব স্থানে রাস্তা সংকুচিত হয়ে কোথাও ৮ ফুটে নেমে এসেছে। অথচ সাধারণ বাসিন্দাদের অনেকের বসতবাড়ির অংশ ভেঙে জায়গা নেওয়া হয়েছে।
সড়কের শেষ প্রান্তে ফেনী পৌরসভার সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আজিজুল হকের ভবনের পাশেই রাস্তার প্রস্থ সবচেয়ে কম—প্রায় ৮ ফুট পাওয়া গেছে। তবে আজিজুল হক সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, “আমি প্রায় দুই বছর ধরে ওখানে যাই না। আমার ভবনের পাশে পরিমাপ ঠিকই আছে। পৌরসভা কীভাবে অন্যদের ভবন বাঁচিয়ে ড্রেন ও রাস্তা বাঁকা করেছে, তা অনুসন্ধান করলেই আসল সত্য বেরিয়ে আসবে।”
এই বিষয়ে ফেনী পৌরসভার উপসহকারী প্রকৌশলী বিপ্লব কুমার নাথের দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্তব্যে তৈরি হয়েছে নতুন বিতর্ক। আজিজুল হকের ভবনের পাশের সরু রাস্তার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি মন্তব্য করেন, “আজিজুল হকের ভবন আপনি ভেঙে দিন, আমরা কাজ করে দেব।”
এদিকে সড়কের মাঝখানে থাকা বিদ্যুতের খুঁটি সরানো নিয়ে তৈরি হয়েছে ধোঁয়াশা। শাহআলম টাওয়ারের মালিক শাহআলমসহ স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, খুঁটি সরানোর কথা বললে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান প্রতিটি খুঁটির জন্য ৫ হাজার টাকা করে উৎকোচ দাবি করেছে। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘দি নিউ ট্রেটলিং’-এর প্রতিনিধি রানা এই অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেন, বিদ্যুতের খুঁটি সরানোর দায়িত্ব তাদের নয়। অন্যদিকে পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জাকির উদ্দিন জানান, প্রকল্পের ডিজাইন অনুসারেই কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
সড়কের এই করুণ দশায় চরম উদ্বেগে রয়েছেন এলাকাবাসী। তাদের আশঙ্কা, সরু রাস্তা আর মাঝখানের খুঁটির কারণে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সবচেয়ে বড় বিপদের বিষয় হলো—কোনো জরুরি পরিস্থিতিতে অগ্নিনির্বাপক ফায়ার সার্ভিস বা রোগীদের বহনকারী অ্যাম্বুলেন্স এই সরু গলি দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।
এ প্রসঙ্গে ফেনী পৌরসভার প্রশাসক নুরুদ্দীন মোহাম্মদ শিবলী নোমান জানান, অভিযোগ পেলে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
জনগণের টাকায় বাস্তবায়িত এই উন্নয়ন প্রকল্প শেষ পর্যন্ত এলাকাবাসীর জন্য আশীর্বাদ না হয়ে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গোলাপবাগ সড়কের এই নকশাবহির্ভূত নির্মাণকাজ, কার্যাদেশের অনিয়ম এবং জায়গা বরাদ্দের বৈষম্য নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে খতিয়ে দেখে দ্রুত বিদ্যুতের খুঁটি অপসারণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাধারণ মানুষ।

মন্তব্য করুন