ইবিতে প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ বৈদ্যুতিক শাটল, আয় কমে লোকসানের শঙ্কা

বৃহস্পতিবার, ১৪ মে ২০২৬ | ১২:৫৬ অপরাহ্ণ

ইবিতে প্রত্যাশা মেটাতে ব্যর্থ বৈদ্যুতিক শাটল, আয় কমে লোকসানের শঙ্কা
apps

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে (ইবি) শিক্ষার্থীদের যাতায়াত সহজ করতে চালু হওয়া বৈদ্যুতিক শাটল (ইভি) প্রকল্পটি প্রত্যাশিত সাড়া না পাওয়ায় লোকসানের মুখে পড়েছে। পরিবেশবান্ধব এই যান চালুর সময় প্রশাসনের উচ্চ প্রত্যাশা থাকলেও যাত্রী সংকট, আয় কমে যাওয়া এবং পরিচালনাগত নানা সমস্যায় প্রকল্পটির কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

২০২৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে ১৪ আসনের চারটি বৈদ্যুতিক শাটল কার চালু করা হয়। প্রশাসন ভবন চত্বরে এর উদ্বোধন করেন উপাচার্য ড. নকীব মোহাম্মদ নসরুল্লাহ। জনপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয় পাঁচ টাকা।

বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, কিস্তিতে গাড়ি কিনলে প্রতিটির দাম প্রায় ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত পড়ত। তাই প্রশাসন অভ্যন্তরীণ তহবিল থেকে নগদ অর্থ নিয়ে প্রায় ৪৪ লাখ টাকায় চারটি গাড়ি কেনা হয়। এতে বাইরের উচ্চ সুদ এড়ানো গেলেও তহবিলের বিপরীতে কিছু সুদ দিতে হচ্ছে।

প্রথম দিন চারটি ইভি থেকে আয় হয়েছিল প্রায় ১১০০ থেকে ১২০০ টাকা। শুরুতে ধারণা ছিল, পরিচিতি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আয়ও বাড়বে। কিন্তু বাস্তবে সময়ের সঙ্গে আয় কমে যায়। হিসাব অনুযায়ী, প্রকল্পের সুদ ও ব্যয় মেটাতে মাসে অন্তত ৬০ হাজার টাকা আয় প্রয়োজন।

প্রথমদিকে চালকদের বেতনভিত্তিকভাবে নিয়োগ দেওয়ার চিন্তা থাকলেও তা বাস্তবসম্মত হয়নি। কারণ ইভি থেকে যে আয় হচ্ছিল, তা দিয়ে সুদ পরিশোধের পাশাপাশি চালকদের বেতন দেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। পরে সিদ্ধান্ত হয়, চারটি ইভি সাপ্তাহিক চুক্তিভিত্তিক চালকদের কাছে দেওয়া হবে। শর্ত অনুযায়ী, প্রতিটি গাড়ির জন্য সপ্তাহে ৪ হাজার টাকা করে জমা দেওয়ার চুক্তি করেন তারা।

তবে বাস্তবে সেই লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হচ্ছে না। বিগত সপ্তাহে চালকেরা নির্ধারিত ৪ হাজার টাকার পরিবর্তে কেউ ৩২০০ টাকা, কেউ ৩৭০০ টাকা, কেউ ৩৮০০ টাকা জমা দিয়েছেন। এতে প্রকল্পটি এখনো লোকসানে রয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

শুরু থেকেই প্রকল্পটি নানা সমস্যার মুখোমুখি হয়। একটি ইভি স্থানীয় ভ্যানের সঙ্গে সংঘর্ষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে প্রায় ২০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়। এছাড়া আরেকটি গাড়ি ব্যাটারি সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন ধরে অচল অবস্থায় রয়েছে। সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানকে বিষয়টি জানানো হলেও এখনো সমাধান হয়নি।

পরিবহন অফিস সূত্রে, ক্যাম্পাসে চলাচলকারী ভ্যানগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় এনে সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করলে ইভির যাত্রী বাড়তে পারে—এমন প্রস্তাবও উঠেছিল। এ বিষয়ে ট্রেজারার ও উপাচার্যের সঙ্গে আলোচনা হলেও প্রক্টর ও ছাত্র উপদেষ্টা আপত্তি জানান। তাদের আশঙ্কা ছিল, স্থানীয় ভ্যানচালকদের সঙ্গে সংঘাত তৈরি হতে পারে।

সরেজমিনে দেখা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় বাইরের দর্শনার্থী, ঘুরতে আসা অতিথি এবং ছুটির দিনের পর্যটকেরাই ইভিতে বেশি ওঠেন। শিক্ষার্থীদের অনেকে নিয়মিত এই সেবা ব্যবহার করেন না।

ক্যাম্পাসে বর্তমানে প্রায় ৫০টি ভ্যান চলাচল করে। দ্রুত ক্লাসে যাওয়া, সভা বা বিভাগীয় কাজে পৌঁছানোর জন্য শিক্ষার্থীরা ভ্যানকেই বেশি প্রাধান্য দেন। অন্যদিকে ইভি নির্দিষ্ট স্টপেজে দাঁড়ায় এবং চার-পাঁচজন যাত্রী না হলে ছাড়ে না। ফলে তাৎক্ষণিক যাতায়াতে শিক্ষার্থীরা ভ্যানকে বেশি সুবিধাজনক মনে করেন।

একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, ইভি আরামদায়ক ও পরিবেশবান্ধব হলেও দৈনন্দিন দ্রুত চলাচলের জন্য এটি সবসময় কার্যকর নয়। ক্যাম্পাসে ক্লাস, পরীক্ষা, বিভাগীয় কার্যক্রম বা বিভিন্ন জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যেতে হলে তারা ভ্যানকেই বেশি সুবিধাজনক মনে করেন। শিক্ষার্থীদের মতে, ইভি সাধারণত ৪-৫ জন যাত্রী না হলে ছেড়ে যায় না, ফলে অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়। এছাড়া ইভির নির্দিষ্ট কিছু স্টপেজ রয়েছে, শুধুমাত্র সেসব স্থানেই এটি থামে। ফলে গন্তব্যে পৌঁছাতে অতিরিক্ত সময় লাগে। এ কারণে সময় বাঁচাতে অধিকাংশ শিক্ষার্থী ভ্যান ব্যবহারকেই বেশি প্রাধান্য দেন।

পরিবহন প্রশাসক ড. শেখ আব্দুর রউফ বলেন, প্রকল্পটি সচল রাখতে প্রশাসন নানা উদ্যোগ নিয়েছে। টিকিট ব্যবস্থা, চালকদের চুক্তিভিত্তিক পরিচালনা, সচেতনতামূলক স্টিকার, ভ্যান নিবন্ধনের প্রস্তাব—সবই বিবেচনায় আনা হয়েছে। এছাড়া ভবিষ্যতে একটি ইভিকে শিক্ষকদের পরিবহন, একটি শিক্ষার্থীদের সার্ভিসিং কার এবং আরেকটি কর্মকর্তা ও অতিথিদের ব্যবহারের জন্য চালুর প্রস্তাব দেওয়া যেতে পারে।

Development by: webnewsdesign.com