ঢাকা
১৫ জুন ২০২৬
সর্বশেষ
Advertise with us

নদীর তীরে জন্ম নেয় স্বপ্ন, নৌকার গায়ে ভাসে জীবনের গল্প

বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিবেদক
সোমবার, ১২ জানুয়ারি ২০২৬   ২৪২ বার পঠিত
নদীর তীরে জন্ম নেয় স্বপ্ন, নৌকার গায়ে ভাসে জীবনের গল্প

ভোরের আলো ফুটতেই গজারিয়া বাজারের আকাশ ভরে ওঠে কাঠে হাতুড়ির ঠকঠক শব্দে। নদীর হাওয়ার সঙ্গে মিশে যায় করাতের গন্ধ, শ্রমিকের ঘাম আর স্বপ্নের রঙ। এখানে প্রতিদিন জন্ম নেয় নতুন নৌকা আর সেই নৌকার গায়ে ভেসে ওঠে শত শত পরিবারের জীবনের গল্প।

ভোলার লালমোহন, চরফ্যাশনের গজারিয়া ও আশপাশের এলাকায় নৌকা শুধু যাতায়াতের বাহন নয়, এটি জীবন। যারা এই নৌকা বানান, স্থানীয়ভাবে তারা পরিচিত নৌকা ব্যাপারী নামে। বাপ-দাদার হাত ধরে শেখা এই পেশাই বদলে দিয়েছে বহু পরিবারের ভাগ্য।

তেমনি একজন আলতাফ হোসেন তার চোখে আজও ভাসে শৈশবের ছবি বাবার পাশে দাঁড়িয়ে কাঠ ঘষা, নৌকার গায়ে প্রথম পেরেক ঠোকা। চার দশক ধরে তিনি এই পেশায়। তাঁর কারখানায় এখন চারজন মিস্ত্রি কাজ করেন। চরফ্যাশন, দক্ষিণ আইচা, শশীভূষণ, মনপুরা দূরদূরান্ত থেকে জেলেরা আসেন তাঁর কাছে।

আলতাফ হোসেন বলেন, জেলেদের চাহিদামতো নৌকা বানাই। বর্ষায় ভালো লাভ হয়, শীতে কাজ কমে যায়। তবুও এই কাজেই আমাদের সংসার চলে।

গজারিয়া বাজারে এমন আলতাফ হোসেন শুধু একজন নন। মো. নাগর, কালাম, আলমগীর, বেল্লাল, হাসান, মিলন, আল-আমিন, শানু, ইকবাল, জুয়েল, শেখ ফরিদ, আমির কমপক্ষে ১৫ জন ব্যাপারী প্রতিদিন কাঠ আর ঘামের বন্ধনে গড়ে তুলছেন ভবিষ্যৎ। তাঁদের কারখানাগুলোতে কাজ করেন শতাধিক শ্রমিক।

ফয়সাল নামের একজন ব্যাপারী বলেন,সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজ চলে। নৌকা বানিয়ে জেলেরা নিয়ে যায়। সরকারিভাবে কোনো সহায়তা পাইনি। যদি আর্থিক সহায়তা মিলত, এই শিল্প আরও এগোত।

চরফ্যাশন-ভোলা মহাসড়কের কোল ঘেঁষে গজারিয়া বাজারে প্রায় অর্ধশত বছর ধরে চলছে এই নৌ-শিল্প। মেঘনা ও তেঁতুলিয়া নদীতে মাছ ধরতে নৌকা অপরিহার্য তাই ছয় মাস কারিগরদের ব্যস্ততা থাকে তুঙ্গে । এখানে মূলত দুই ধরনের নৌকা বানানো হয়। ডিঙি ও কোষা। কোষা ৯-১০ ফুট, ডিঙি ১৫-১৬ ফুট। কাঠ ও উপকরণ প্রস্তুত থাকলে দিনে দুই থেকে তিনটি নৌকা বানানো যায়। সবচেয়ে বেশি চাহিদা কোষা নৌকার।

রেইনট্রি, কড়ই, চাম্বুল, সুন্দরী কখনো মেহগনি কাঠ সঙ্গে পেরেক, তারকাটা, জলুয়া। ১২ হাতের একটি নৌকা বানাতে তিন শ্রমিকের মজুরি ৩-৪ হাজার টাকা, কাঠে ৪ হাজার, আনুষঙ্গিকে ৩ হাজার। মোট ৯-১০ হাজার টাকায় তৈরি নৌকা বিক্রি হয় ১৪-১৫ হাজারে। লাভ অল্প, তবু টিকে থাকার লড়াই থামে না। অনেকেই ঋণ নিয়ে কাজ চালান। তাঁদের আকাঙ্ক্ষা বিনা সুদে সরকারি ঋণ পেলে এই শিল্প আরও শক্ত হবে।

স্থানীয় স্কুল শিক্ষক রিয়াজুর কবির বলেন, প্রায় ৪০ বছর ধরে এই শিল্প চলছে। শতাধিক পরিবার এতে যুক্ত। তারা পরিবার চালাচ্ছে, দেশের অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।সরঞ্জামের দাম বেড়েছে। ধারদেনা করে শিল্প টিকিয়ে রেখেছেন তারা। এই নৌ-শিল্প বাঁচাতে এখন সরকারি সহায়তার বিকল্প নেই।

নদীমাতৃক বাংলাদেশে যেখানে অনেক ঐতিহ্য হারিয়ে যাচ্ছে, গজারিয়ায় এখনো বেঁচে আছে নৌকার স্বপ্ন। হাতের নিপুণ ছোঁয়ায় তৈরি প্রতিটি নৌকা যেন বলে এই নদীর পাড়ে মানুষ এখনো স্বপ্ন বানায়, কাঠে খোদাই করে ভবিষ্যৎ।

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us