বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা বাংলাদেশের রপ্তানির ওপর চাপ পড়েছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
সোমবার জাতীয় সংসদের প্রশ্নোত্তরে সরকার দলীয় সংসদ সদস্য (পাবনা-৫) শামসুর রহমান শিমুলের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদী এ কথা বলেন। এর আগে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে সংসদের বৈঠক শুরু হয়।
বিজ্ঞাপন
প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময় মন্ত্রী চলমান ইরান ও ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধকে ইরানকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সামরিক উত্তেজনা বলে উল্লেখ করেন।
ওই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে সাম্প্রতিক অস্থিরতা বৈশ্বিক অর্থনীতি ও বাণিজ্য প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা রয়েছে এবং বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়। মধ্যপ্রাচ্য বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। বাংলাদেশ হতে প্রধানত তৈরি পোশাক, ঔষধ, হিমায়িত খাদ্য ও চামড়াজাত ইত্যাদি পণ্য সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, কাতার ও ওমানের বাজারে রপ্তানি হয়ে থাকে।
তিনি বলেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে চলমান অস্থিরতা জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধিতে ভূমিকা রয়েছে, যার আমদানি ব্যয়, শিপিং ও বীমা খরচ বৃদ্ধি, মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি হ্রাস, দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি এবং রেমিট্যান্স প্রবাহে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টির আশংকা তৈরি করেছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি রপ্তানির ওপর কিছুটা চাপ তৈরি হয়েছে। এটি দীর্ঘায়িত হলে রেমিট্যান্সের ওপরও চাপ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, চলমান সংকট মোকাবিলায় সামগ্রিক পরিস্থিতি সরকার পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় অনেকগুলো পদক্ষেপ তুলে ধরা হয়েছে উল্লেখ করে তিনি লজিস্টিক ব্যয় কমানো, যুদ্ধ সংশ্লিষ্ট এলাকার বাইরের দেশগুলোতে বাজার সম্প্রসারণের চেষ্টাসহ বেশ কিছু পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন।
ঢাকা-১৮ আসনের এস এম জাহাঙ্গীর হোসেনের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আবদুল মুক্তাদীর জানান, সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে নেপাল, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপ ছাড়া অন্য সব দেশের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি রয়েছে। ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতি সব চেয়ে বেশি।
মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের সাথে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ সাত হাজার ৮৬০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। এছাড়া অন্যান্য দেশের মধ্যে পাকিস্তানের সাথে ৬৮১ মিলিয়ন, আফগানিস্তানের সাথে ১০ দশমিক ৭১ মিলিয়ন, ভুটানের সাথে ২৯ দশমিক ৭৭ মিলিয়ন বাণিজ্য ঘাটতি হয়েছে। অপরদিকে নেপালের সাথে ২৯ দশমিক ৯ মিলিয়ন, শ্রীলঙ্কার সাথে ৬ দশমিক ২৫ মিলিয়ন ও মালদ্বীপের সাথে দুই দশমিক ৮৫ মিলিয়ন বাণিজ্য উদ্বৃত্ত রয়েছে।
কুমিল্লা-৯ আসনের আবুল কালামের প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী সংসদে গত ৫ বছরের রপ্তানি পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। মন্ত্রীর তথ্য অনুযায়ী ২০২০-২১ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৪৫ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন, ২০২১-২২ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৬০ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন, ২০২২-২৩ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫৩ দশমিক ৯৩ বিলিয়ন, ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫১ দশমিক ১১ বিলিয়ন এবং ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে রপ্তানি আয় ৫৫ দশমিক ১৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানার প্রশ্নের জবাবে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, জাতীয় বাজেটে বিভিন্ন পণ্যের উপর আরোপিত আমদানি শুল্ক হ্রাস অথবা সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের প্রস্তাব গ্রহণ করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১১০টি পণ্যের শুল্ক রহিত এবং ৬৫টি পণ্যের শুল্ক হ্রাস করা হয়েছে।
পরে সম্পূরক প্রশ্নে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কথা উল্লেখ করে রুমিন ফারহানা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হবে কি না, নিলে সেটা কী? তা জানতে চান।
জবাবে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি পাবে না বলে মনে করেন বাণিজ্যমন্ত্রী। এর কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে মন্ত্রী বলেন, প্রথমে মূল্যস্ফীতিটা সেভাবে বৃদ্ধি পাবে না কেন এটা একটু বোঝা দরকার। সারা পৃথিবীতে জ্বালানির মূল্য যে অনুপাতে বৃদ্ধি পেয়েছে তার তুলনায় বাংলাদেশের যে মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে সেটা অত্যন্ত সামান্য।
মন্ত্রী বলেন, আমেরিকায় স্টেট টু স্টেট ভেরি করে, তাদের নিজস্ব ট্যাক্সের কারণে। এই যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে অনেক স্টেটে জ্বালানি তেল প্রতি গ্যালন ২ ডলার ৭০ থেকে ৮০ সেন্ট ছিলো। তা ৫ ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছে। আশেপাশের যেকোনো দেশ অথবা বাংলাদেশের সাথে তুলনীয় যেকোনো অর্থনীতির সঙ্গে তুলনা করলে তুলনামূলকভাবে জ্বালানি পেট্রোলিয়াম পণ্যের মূল্য প্রত্যেকটা দেশে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেকগুলি দেশে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধির এই প্রক্রিয়াটি স্বয়ংক্রিয়। এটার জন্য সরকারের আলাদা পদক্ষেপ নিতে হয় না।
বাণিজ্য মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের এখানে যে বৃদ্ধিটা হয়েছে, ডিজেলের ক্ষেত্রে ১০০ টাকার ডিজেলকে আমরা ১১৫ টাকা করেছি। আমি শুধু বোঝার জন্য বলছি, একটা শিল্প কারখানায় তাদের যে কস্ট অব প্রোডাকশন থাকে, তার মধ্যে ৭ থেকে ৮ শতাংশ থাকে জ্বালানির মূল্য। সেই ৭ থেকে ৮ পার্সেন্টের যদি ১০০ পারসেন্ট ধরি তার ১৫% ডিজেলের মূল্য বৃদ্ধি পায়, তবে তা মোট খরচে খুব সামান্য প্রভাব ফেলে। একইভাবে পরিবহনের ক্ষেত্রে, ২০০ কিলোমিটার একটা বাস রান করার জন্য কমবেশি ২৫-৩০ লিটারের মতো ডিজেল লাগে। এই ৩০ লিটার ডিজেলের ক্ষেত্রে সাড়ে চারশ টাকার মতো মূল্য বৃদ্ধি হয়েছে। এই ৩০ লিটার যদি আমি ট্রাকের পণ্য পরিবহনের জন্য হিসাব করি, তবে এই বাড়তি মূল্যের ভারটা পড়বে ১০ হাজার কেজি পণ্যের উপরে ।’
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, তার মানে এমনি শুনলেই যেটা মনে হয় যে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, কিন্তু আমরা যদি পরিবাহিত পণ্যের ইউনিটের হিসাব করি, তাহলে সেই বৃদ্ধিটা মূল্যস্ফীতির জন্য ওরকম উদ্দীপক বা এলিমেন্ট না। এটা ঠিক আপনি অর্থনীতিকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যেতে পারবেন না, যেখানে ফান্ডামেন্টাল ব্যালেন্সটা ইমব্যালেন্স হয়ে যায়। সেজন্য পৃথিবীর সব দেশ যে নীতি নিয়েছে আমরা সেই নীতি মডেলটি নিয়েছি এবং খুবই একটা মডারেট মূল্য বৃদ্ধি করেছি।
বিদেশে এক কোটি ৩০ লাখের বেশি কর্মী কর্মরত
মৌলভীবাজার-১ আসনের নাছির উদ্দিন আহমেদের প্রশ্নের জবাবে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, বর্তমানে বিশ্বের ১৭৬টি দেশে এক কোটি ৩০ লাখের বেশি কর্মী কর্মরত রয়েছে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনের শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের প্রশ্নের জবাবে আরিফুল হক চৌধুরী জানান, ২০০৪ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত বিদেশে পাঠানো কর্মীর সংখ্যা এক কোটি ৪৪ লাখ ৮১ হাজার ৭৪৫ জন। এই সংসদ সদস্যের প্রশ্নের জবাবে সংসদে মন্ত্রীর উপাস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ২৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন, ২০২৪-২৫ অর্থ বছরে ৩০ দশমিক ৩২ বিলিয়ন ও চলতি অর্থ বছরের মার্চ পর্যন্ত ২৯ দশমিক ২২ বিলিয়ন রেমিট্যান্স এসেছে।
নোয়াখালী-৩ আসনের আবদুল হান্নান মাসউদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, ২০২৫ সালে ১১ লাখ ৩২ হাজার ৫১৯ জন কর্মীর বৈদেশিক কর্মসংস্থান হয়েছে। এর মধ্যে নারী কর্মীর সংখ্যা ৬২ হাজার ৩৫২ জন।
প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরীর অনুপস্থিতিতে প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক (নুর) সংসদ সদস্যদের প্রশ্নের জবাব দেন।
টাঙ্গাইল-৭ আসনের আবুল কালাম আজাদ সিদ্দিকীর প্রশ্নের জবাবে খাদ্য প্রতিমন্ত্রী আব্দুর বারী জানান, দেশের সরকারি খাদ্য গুদামে বর্তমানে ১৭ দশমিক ৭১ লাখ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য মজুদ রয়েছে। এর মধ্যে চাল ১৪ দশমিক ৬৪ লাখ মেট্রিক টন ও গত তিন দশমিন শূন্য ৭ লাখ মেট্রিক টন। সরকারি খাদ্যগুদামে মজুদ সন্তোষজনক দাবি করেন প্রতিমন্ত্রী।
Development by: webnewsdesign.com