ঢাকা
০৭ জুন ২০২৬
সর্বশেষ
Advertise with us

হারিয়ে যাচ্ছে বাউফলের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প

বাংলাদেশ মিডিয়া প্রতিবেদক
বুধবার, ১৮ আগস্ট ২০২১   ৩২২ বার পঠিত
হারিয়ে যাচ্ছে বাউফলের ঐতিহ্যবাহী বাঁশ-বেত শিল্প

ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে বাউফলের ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ শিল্পের অন্যতম বাঁশ ও বেত শিল্প। গ্রামের গৃহস্থ্যদের কৃষি ও নিত্যনৈমিত্তিক সাংসারিক কাজে বাঁশ ও বেত দ্বারা নির্মিত সাঁজি,ডোলা,খাড়ই, মাটি কাটার ওড়া, ধান-চালসহ রবিশষ্য ওজন করার পুড়া, চালন, কুলা, গরুর মুখের ঠুলি, হাস-মুরগি পালনের খাঁচা, মাছ ধরার হাগরা, পল্লা ইত্যাদি পণ্যগুলো এক সময় ছিল গৃহস্থ্যদের অপরিহার্য। কিন্তু দিনবদলে এখন গৃহস্থ্যরাও এই পণ্যগুলো ব্যবহারে অনিহা প্রকাশ করছেন।

খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বাউফলের দাশপাড়া ও বাউফল সদর ইউনিয়নের গোসিংগা এলাকায় প্রায় শতাধিক পরিবার এখনো এই পণ্য নির্মাণ করে হাটে হাটে বিক্রি করে তাদের জীবিকা নির্বাহ করছেন। একসময় প্রায় তিন শতাধিক পরিবার এই কাজের সাথে জড়িত ছিল। কিন্তু ক্রমেই কমে আসছে এই সংখ্যা। বাঁশ-বেতের পণ্যের চাহিদা হৃাস পাওয়ায় ধীরে ধীরে এই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট শিল্পীরা অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।

বাউফলের দাশপাড়া গ্রামের সুরেন কীর্ত্তনীয়া, অমূল্য কবিরাজ, মিল্টন কবিরাজ, বিরাজ বেপারী, সতিশ ঘরামীসহ অনেক বাঁশ-বেত শিল্পীরা জানান, বাঁশ ও বেত দিয়ে যে সকল পণ্য তৈরী করা হয় সেগুলোই এখন প্লাষ্টিক দিয়ে তৈরী হচ্ছে। মানুষ ধীরে ধীরে অতিকতর বেশি টেকসই প্লাষ্টিক পণ্যের দিইে ঝুঁকছে। তাছাড়া এখন আর বেত পাওয়া যায় না। এক সময় আমাদের অঞ্চলের বিভিন্ন বাগানে এবং বাড়িতে প্রচুর বেত লাগানো হতো। গৃহস্থ্যরা ওই বেত বিক্রি করতো। কিন্তু বর্তমানে বেত লতা পাওয়াই যায়না।

বাঁশ নিয়ে তৈরী পণ্যগুলোকে বেত দিয়ে বাঁধলে সেই পণ্য দীর্ঘদিন টেকসই হতো। এখন বেতের পরিবর্তে গুনা অথবা প্লাষ্টিকের রশি দিয়ে বাঁধতে হচ্ছে। ফলে বাঁশের তৈরী পণ্য দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অপরদিকে বাঁশের চাষও অনেকাংশে কমে যাচ্ছে। প্রয়োজনীয় বাঁশ না পাওয়ার কারণে সময় মেতা পণ্য তৈরী করা যাচ্ছে না। যে পরিমাণ বাঁশ পাওয়া যায় তার দাম অনেক। বেশি দামে বাঁশ কিনে পণ্য তৈরী করে বেশি দামে বিক্রি করতে গিয়ে প্লাষ্টিক পণ্যের কাছে হেরে যাচ্ছি। একারণেও মানুষ বাঁশ দিয়ে তৈরী পণ্যের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।

বাউফল সদর ইউনিয়নের গোসিংগা গ্রামের পুষ্প রানী, জোৎস্না রানী, সন্ধা রানী, বিশ্বেশ্বের ঘরামী, গোবিন্দ ঘরামী এবং বাবুল মাঝি জানান, আমারা এখনো এই পণ্যগুলো তৈরী করে যাচ্ছি। তবে দিন দিন চাহিদা কমে যাচ্ছে বলে তারাও জানিয়েছেন। ওই শিল্পীরা আরো জানান, একাজ করে এখন আর সংসার চলে না। তারপরেও পূর্ব পুরুষের কাজটিকে আমরা টিকিয়ে রাখতে চেষ্টা করে যাচ্ছি। তারাও জানান, বেত এখন আর পাওয়া যায়না এবং বাঁশের অনেক দাম। একশত টাকার একটি পণ্য তৈরী করতে কমপক্ষে ৫০ টাকার বাঁশ লাগে। তারপর মুজুরী। এরপর তৈরীকৃত পণ্য হাট-বাজারে নিয়ে বিক্রি করে তেমন লাভ হয় না।

দেশের দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম প্রসিদ্ধ হাট বাউফলের কালাইয়া বন্দর হচ্ছে এগুলো বিক্রির অন্যতম বাজার। সরেজমিন ওই বাজারে গিয়ে দেখা গেছে, প্রায় ৩০টি পরিবারের পক্ষ থেকে বাঁশের নির্মিত পণ্য নিয়ে পশোরা সাজিয়ে বসেছেন। তবে বেতের তৈরী কোন পণ্য চোখে পড়েনি। বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা কিছু বেপারী পাইকারী হিসেবে বাঁশের কিছু কিছু পণ্য ক্রয় করছেন। স্থানীয় কিছু কিছু গৃহস্থ্যরাও কিছু কিছু পণ্য ক্রয় করছেন। পণ্য বিক্রি করতে আসা প্রায় সকলেই জানান, তাদের হাতের তৈরী এই পন্যগুলো বিক্রি করতে গিয়ে ইজারাদারদের অনেক টাকা খাজনা দিতে হচ্ছে। যার কারণে বিক্রয়ের পর লাভ খুবই কম থাকে।

স্থানীয় সুশীল সমাজের নেতৃবৃন্দ মনে করেন, বাঁশ ও বেত শিল্প আমাদের ঐতিহ্য। এই শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে সরকারের ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প বিভাগের সহায়তা দরকার। তাদের সহযোগিতা পেলে এবং পচঁনহীন প্লাষ্টিকের কুফলগুলো মানুষকে বোঝাতে পারলে এই শিল্প টিকে থাকবে। অন্যথায় এক সময় হয়তো ঐকিহ্যবাহী এই শিল্পকর্ম হারিয়ে যাবে।

দৈনিক বাংলাদেশ মিডিয়া/এসআরসি-১৮

Facebook Comments Box
Advertise with us
Advertise with us
Advertise with us