ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে ক্ষমতার পালাবদল নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও চলছে নানা বিশ্লেষণ ও আলোচনা। বিশেষ করে দীর্ঘ সময় পর সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস ও মমতা ব্যানার্জির বিদায় এবং বিজেপির ক্ষমতায় আসা দুই দেশের সম্পর্কের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হয়েছে বিভিন্ন মহলে।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলো মনে করছে, এই পরিবর্তনের ফলে সীমান্ত, নদী ও অভিবাসন ইস্যু— বিশেষ করে তিস্তা নদীর পানি বণ্টন, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পুশ-ইন বা পুশ-ব্যাক ইস্যু আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।অনেকেই আশঙ্কা করছেন, নির্বাচনের আগে ভারতীয় রাজনৈতিক নেতাদের কিছু মন্তব্য দুই দেশের সম্পর্ককে জন্য ক্ষতিকর।
এ বিষয়ে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের ওপর সরাসরি বড় প্রভাব ফেলবে না, তবে কিছু মন্তব্য সামনে আসতে থাকলে ভবিষ্যতে সম্পর্কের ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
এনসিপির মুখপাত্র বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে বিভিন্ন সময়ে সেখানকার কিছু নেতা বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের জনগণ নিয়ে উদ্বেগজনক মন্তব্য করেছেন, যা দুঃখজনক। পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে আমাদের বড় সীমান্ত আছে এবং সম্পর্কের মাত্রা বহুমাত্রিক। এর মধ্যে এ ধরনের মন্তব্য সামনেও আসতে থাকলে সেটি এদেশেও প্রভাব ফেলতে পারে।’
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার মনে করেন, ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিকে সরাসরি প্রভাবিত করবে না। তবে ভারতের রাজনৈতিক আদর্শ ও সাম্প্রদায়িকতার প্রসঙ্গ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি।
বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের রাজনীতিকে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের প্রভাব পড়বে না এবং বাংলাদেশের উগ্রবাদীদের উৎসাহিত হবার আশঙ্কা তারাও খুব একটা দেখছে না। তবে তাদের সাম্প্রদায়িকতা ও উগ্রবাদীতা আমাদের উদ্বেগের বড় কারণ। তাদের রাষ্ট্রের যে আদর্শ ধর্মনিরপেক্ষতা সেটিই তারাই তো মানছে না। মুসলিমের ওপর যে নিগ্রহ সেটি তো সব দেখা যায় না। ভারত ধর্মনিরপেক্ষ থাকলে তো অন্য ধর্মের লোকেরা নিরাপদে থাকতো।’
বিপরীতে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বিষয়টিকে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন। তার মতে, প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের দিকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচন একেবারেই ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয় এবং সেখানকার মানুষ ভোটের মাধ্যমে তাদের গণতান্ত্রিক অধিকারের চর্চা করেছে। তবে নিকটতম প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’
যারাই ক্ষমতায় থাকুক দুই দেশের সম্পর্ক আরও এগিয়ে যাবে এবং এ থেকে জনগণ উপকৃত হবে। পারস্পারিক ন্যায়পরায়ণতার ভিত্তিতে নিশ্চয়ই দুই দেশ সম্পর্ককে আরও এগিয়ে নেবে বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর এ উপদেষ্টা।
বাম রাজনীতির নেতা মুজাহিদুল ইসলাম সেলিমের মতে, পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এসেছে। বাংলাদেশেও একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি রয়েছে।
তিনি বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির জয়ের মধ্য দিয়ে একটি সাম্প্রদায়িক শক্তি ক্ষমতায় এলো এবং এটিও সত্যি যে একই ধরনের সাম্প্রদায়িক শক্তি বাংলাদেশেও আছে। বৈশ্বিক রাজনীতি বিশ্লেষণ করলে বোঝা যাবে ভারতবর্ষের রাজনীতিও একই সংকটে নিপতিত। সেখানে যারাই ক্ষমতায় আসুক বা থাকুক তাতে সংকটের সমাধান হবে না কারণ তারা সবাই বুর্জোয়া ও কর্পোরেট শক্তির ধারক বাহক। তবে আমি বিশ্বাস করি দুই দেশের সাধারণ মানুষ গণতন্ত্র ও অসাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতেই সমাজকে এগিয়ে নেবে।’
এর মধ্যে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ স্পষ্টভাবে বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গে যেই ক্ষমতায় আসুক না কেন, বাংলাদেশ তার দ্বিপাক্ষিক স্বার্থ ও অমীমাংসিত ইস্যুগুলো নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করে যাবে। প্রতিমন্ত্রী বিবিসি বাংলাকে বলেন, ‘ভারতে যে সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, আমাদের সাথে ইস্যুগুলা কিন্তু রয়েই যায়। ওগুলোতো আমাদের অবশ্যই ডিল করতে হবে।’
বিবিসি বাংলার তথ্য অবলম্বনে প্রতিবেদনটি সম্পাদিত হয়েছে।
Development by: webnewsdesign.com