রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউ কমপ্লেক্সের লিফট সরবরাহে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা ঠিকাদার দাবি করেছেন, তাঁরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার হয়েছেন| বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে|
লিফট সরবরাহে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটি প্রহণ করেনি| লিফট জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ¯^াস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ¯^াস্থ্যসেবা বিভাগে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ| এখন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে তারা|
হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের একাংশের পাঁচতলায় নতুন করে আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়| এই নির্মাণকাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা| এই প্যাকেজের মধ্যেই লিফট ধরা ছিল| ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের ¯^ত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন এই কাজ পান| আইসিইউ ইউনিটে ফায়ার প্রটেক্টেড বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা| কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে সেখানে সাধারণ প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপন করে| লিফটের মান নিয়েও অভিযোগ ওঠে|
এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর ঢাকা থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে| কমিটির প্রতিবেদনে লিফটটি দরপত্রের বিনির্দেশ (স্পেসিফিকেশন) অনুযায়ী নয় বলে প্রমাণ পাওয়ায় ২০২৪ সালের জুন মাসে আগের লিফটি অপসারণ করা হয়| এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর এই লিফট সরবরাহ করে, যা এখনো হাসপাতালে পড়ে রয়েছে|
চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নতুন আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়, কিন্তু জালিয়াতির কারণে এখন পর্যন্ত এই পাঁচতলা ভবনে মুমূর্ষু রোগীদের ওঠানোুনামানোর জন্য কোনো বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট নেই| ফলে রোগীর ¯^জনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে| বিকল্প লিফট ও সিঁড়ি ব্যবহার করে ওঠানামা করতে হচ্ছে|
এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেন সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন করেছেন| তাতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে লিফট আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত স্থানীয় এজেন্ট/ডিলারের মাধ্যমে আমদানি করতে হয়| এ কারণে লিফট আমদানির জন্য ফুজিটেক কোম্পানি লিমিটেডের বাংলাদেশে অনুমোদিত এজেন্ট শেল করর্পোরেশন লিমিটেডের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়| শেল করর্পোরেশন লিমিটেড তাঁকে জাপানের ফুজিটেক কোম্পানি লিমিটেড থেকে লিফট সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়|
চিঠিতে ঠিকাদার আরও উল্লেখ করেন, লিফটের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে| কমিটির প্রতিবেদন থেকে তিনি জানতে পারেন, যে ই-মেইলের মাধ্যমে লিফট আমদানির যাবতীয় ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয়েছে সেই ই-মেইল আইডিটি বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন করা, ইমেইলটি ফুজিটেকের মেইল আইডি নয় এবং লিফটটি জাপান থেকে আমদানি করা হয়নি| এ বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেক হলে বিষয়টি তিনি রাজশাহীর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানান|
তিনি বুঝতে পারেন যে শেল করপোরেশন লিফট আমদানিসংক্রান্ত ডকুমেন্ট সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে| বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তিগত হওয়ায় তখন বিষয়টি তিনি অনুধাবন করতে পারেননি|
ঠিকাদারের দাবি, দরপত্রের কারিগরি বিনির্দেশ অনুসারে লিফটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে কোনো যাচাই-বাছাই করা হয়নি বা মতামত প্রদান করা হয়নি| অথচ দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সরবরাহকৃত মালামালের কারিগরি বিনির্দেশই মূল বিষয়| কাজেই হাসপাতাল কমিটির প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়|
ঠিকাদার চিঠিতে আরও বলেছেন, আমদানিকারক শেল করপোরেশনের ভুল তথ্য প্রদান ও ডকুমেন্ট সরবরাহের কারণে তাঁর ঠিকাদারিপ প্রতিষ্ঠান প্রতারিত হয়েছে| সরবরাহ করা লিফট ও সংশ্লিষ্ট মালামাল দরপত্রের কারগরি বিনির্দেশ মোতাবেক সঠিক আছে| তাই বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন|
তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিফটের মূল অংশ ‘ট্র্যাকশন মোটর’ ও ‘কন্ট্রোল বক্স’ মূল প্যাকিং তালিকায় পাওয়া যায়নি| লিফট অর্ডারের ই-মেইল আইডির সঙ্গে ওয়েব পেজের সামঞ্জস্যতা নেই| যাচাই শেষে-ইমেইল আইডিটি ভুয়া পাওয়া গেছে| মালামাল পরিদর্শনকালে কিছু প্যাকেজ খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়| বারকোড স্ক্যান করে ফুজিটেক পাওয়া যায়নি| প্যাকেজিং লিস্ট প্রস্তুতকারক ফুজিটেক, যার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি সরবরাহকারী, এজেন্ট বা পরিবেশকের উল্লেখ নেই| ফুজিটেক লিফটটি উৎপাদনকারী হিসেবে প্রমাণিত নয়|
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, লিফট একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস| কোনো জানমালের অঘটন ঘটলে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হবে| ঠিকাদারের সরবরাহ করা লিফটটি স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না বলে তদন্ত কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন| তাঁরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করার কারণে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করেছেন|
এ ব্যাপারে হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে গেছে| তাঁরা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন|
Development by: webnewsdesign.com