রামেক হাসপাতালে লিফট নিয়ে জালিয়াতি ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে

‘ক্ষমার দৃষ্টিতে’ দেখার আবেদন ঠিকাদারের

শনিবার, ০২ মে ২০২৬ | ৬:৪৩ অপরাহ্ণ

রামেক হাসপাতালে লিফট নিয়ে জালিয়াতি ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের বিরুদ্ধে
apps

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালের আইসিইউ কমপ্লেক্সের লিফট সরবরাহে জালিয়াতির অভিযোগ ওঠা ঠিকাদার দাবি করেছেন, তাঁরা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের প্রতারণার শিকার হয়েছেন| বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার অনুরোধ জানিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়েছে|

লিফট সরবরাহে জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সেটি প্রহণ করেনি| লিফট জালিয়াতির অভিযোগ তদন্ত করে গত ১৬ ফেব্রুয়ারি ¯^াস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ¯^াস্থ্যসেবা বিভাগে প্রতিবেদন পাঠিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ| এখন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় আছে তারা|

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালের একাংশের পাঁচতলায় নতুন করে আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়| এই নির্মাণকাজের প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল ১০ কোটি ৯৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা| এই প্যাকেজের মধ্যেই লিফট ধরা ছিল| ব্রাদার্স কনস্ট্রাকশনের ¯^ত্বাধিকারী সৈয়দ জাকির হোসেন এই কাজ পান| আইসিইউ ইউনিটে ফায়ার প্রটেক্টেড বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপনে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ কোটি ১৭ লাখ ৩৬ হাজার টাকা| কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে সেখানে সাধারণ প্যাসেঞ্জারস লিফট স্থাপন করে| লিফটের মান নিয়েও অভিযোগ ওঠে|

এ নিয়ে সংবাদ প্রকাশিত হলে গণপূর্ত অধিদপ্তর ঢাকা থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে| কমিটির প্রতিবেদনে লিফটটি দরপত্রের বিনির্দেশ (স্পেসিফিকেশন) অনুযায়ী নয় বলে প্রমাণ পাওয়ায় ২০২৪ সালের জুন মাসে আগের লিফটি অপসারণ করা হয়| এরপর ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ২০২৫ সালের ২ অক্টোবর এই লিফট সরবরাহ করে, যা এখনো হাসপাতালে পড়ে রয়েছে|

চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ২০২৪ সালের শুরুর দিকে নতুন আইসিইউ ইউনিট নির্মাণ করা হয়, কিন্তু জালিয়াতির কারণে এখন পর্যন্ত এই পাঁচতলা ভবনে মুমূর্ষু রোগীদের ওঠানোুনামানোর জন্য কোনো বেড-কাম প্যাসেঞ্জারস লিফট নেই| ফলে রোগীর ¯^জনদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে| বিকল্প লিফট ও সিঁড়ি ব্যবহার করে ওঠানামা করতে হচ্ছে|

এ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিত ঠিকাদার সৈয়দ জাকির হোসেন সম্প্রতি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আবেদন করেছেন| তাতে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশে লিফট আমদানির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত স্থানীয় এজেন্ট/ডিলারের মাধ্যমে আমদানি করতে হয়| এ কারণে লিফট আমদানির জন্য ফুজিটেক কোম্পানি লিমিটেডের বাংলাদেশে অনুমোদিত এজেন্ট শেল করর্পোরেশন লিমিটেডের সঙ্গে তাঁর চুক্তি হয়| শেল করর্পোরেশন লিমিটেড তাঁকে জাপানের ফুজিটেক কোম্পানি লিমিটেড থেকে লিফট সরবরাহের নিশ্চয়তা দেয়|

চিঠিতে ঠিকাদার আরও উল্লেখ করেন, লিফটের গুণগত মান যাচাইয়ের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ একটি কারিগরি কমিটি গঠন করে| কমিটির প্রতিবেদন থেকে তিনি জানতে পারেন, যে ই-মেইলের মাধ্যমে লিফট আমদানির যাবতীয় ডকুমেন্ট সরবরাহ করা হয়েছে সেই ই-মেইল আইডিটি বাংলাদেশে রেজিস্ট্রেশন করা, ইমেইলটি ফুজিটেকের মেইল আইডি নয় এবং লিফটটি জাপান থেকে আমদানি করা হয়নি| এ বিষয়ে সন্দেহের উদ্রেক হলে বিষয়টি তিনি রাজশাহীর গণপূর্ত বিভাগ-২-এর নির্বাহী প্রকৌশলীকে জানান|

তিনি বুঝতে পারেন যে শেল করপোরেশন লিফট আমদানিসংক্রান্ত ডকুমেন্ট সরবরাহের ক্ষেত্রে তাঁর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রতারণার আশ্রয় নিতে পারে| বিষয়টি উচ্চ পর্যায়ের প্রযুক্তিগত হওয়ায় তখন বিষয়টি তিনি অনুধাবন করতে পারেননি|

ঠিকাদারের দাবি, দরপত্রের কারিগরি বিনির্দেশ অনুসারে লিফটি সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, সে বিষয়ে কোনো যাচাই-বাছাই করা হয়নি বা মতামত প্রদান করা হয়নি| অথচ দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী সরবরাহকৃত মালামালের কারিগরি বিনির্দেশই মূল বিষয়| কাজেই হাসপাতাল কমিটির প্রতিবেদন অসম্পূর্ণ বলে প্রতীয়মান হয়|

ঠিকাদার চিঠিতে আরও বলেছেন, আমদানিকারক শেল করপোরেশনের ভুল তথ্য প্রদান ও ডকুমেন্ট সরবরাহের কারণে তাঁর ঠিকাদারিপ প্রতিষ্ঠান প্রতারিত হয়েছে| সরবরাহ করা লিফট ও সংশ্লিষ্ট মালামাল দরপত্রের কারগরি বিনির্দেশ মোতাবেক সঠিক আছে| তাই বিষয়টি ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখার জন্য তিনি অনুরোধ জানিয়েছেন|

তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, লিফটের মূল অংশ ‘ট্র্যাকশন মোটর’ ও ‘কন্ট্রোল বক্স’ মূল প্যাকিং তালিকায় পাওয়া যায়নি| লিফট অর্ডারের ই-মেইল আইডির সঙ্গে ওয়েব পেজের সামঞ্জস্যতা নেই| যাচাই শেষে-ইমেইল আইডিটি ভুয়া পাওয়া গেছে| মালামাল পরিদর্শনকালে কিছু প্যাকেজ খোলা অবস্থায় পাওয়া যায়| বারকোড স্ক্যান করে ফুজিটেক পাওয়া যায়নি| প্যাকেজিং লিস্ট প্রস্তুতকারক ফুজিটেক, যার ওয়েবসাইটে বাংলাদেশি সরবরাহকারী, এজেন্ট বা পরিবেশকের উল্লেখ নেই| ফুজিটেক লিফটটি উৎপাদনকারী হিসেবে প্রমাণিত নয়|

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, লিফট একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ ইলেকট্রনিক ডিভাইস| কোনো জানমালের অঘটন ঘটলে দায়দায়িত্ব নির্ধারণ করা কঠিন হবে| ঠিকাদারের সরবরাহ করা লিফটটি স্থাপন করা যুক্তিযুক্ত হবে না বলে তদন্ত কমিটির সব সদস্য একমত হয়েছেন| তাঁরা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করার কারণে ঠিকাদার ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে বলেও সুপারিশ করেছেন|
এ ব্যাপারে হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ আবু হেনা মোস্তফা কামাল বলেন, তাঁদের তদন্ত প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে গেছে| তাঁরা মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছেন|

Development by: webnewsdesign.com