হাওরের পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো, দুশ্চিন্তায় হাজারো কৃষক

সোমবার, ২৫ মে ২০২৬ | ৬:২২ অপরাহ্ণ

হাওরের পানিতে তলিয়ে গেছে বোরো, দুশ্চিন্তায় হাজারো কৃষক
apps

হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা সদরগামী সড়ক সড়কের দুই পাশে ছড়িয়ে থাকা জারুলগাছে ফুটেছে বেগুনি ফুল। প্রকৃতির এমন মনোমুগ্ধকর সৌন্দর্য মুহূর্তেই ম্লান হয়ে যায় বাতাসে ভেসে আসা পচা খড় ও নষ্ট ধানের গন্ধে। কোথাও রাস্তার পাশে, কোথাও খলায়, আবার কোথাও বাড়ির উঠোনে কৃষকদের দেখা যায় ভেজা খড় থেকে ধান আলাদা করার শেষ চেষ্টা করতে। বানিয়াচং উপজেলার কৃষক সাহেব আলী জানান, আকস্মিক অতিবৃষ্টিতে খাগাপাশা হাওরের পানিতে তাঁর প্রায় ৭ কিয়ার জমির পাকা ধান তলিয়ে যায়। কোথাও কোমর, কোথাও গলাসমান পানির নিচ থেকে ধান কেটে যা উদ্ধার করতে পেরেছেন, তা সর্বোচ্চ ৫০ মণ হবে। অথচ গত বছর একই জমি থেকে প্রায় ২০০ মণ ধান পেয়েছিলেন তিনি।

শুধু সাহেব আলী নন, চলতি বছরের বৈশাখ মাসের অতিবৃষ্টিতে হবিগঞ্জের হাওরাঞ্চলের হাজারো কৃষকের বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। কোরবানির ঈদের আগে একমাত্র ফসল ঘরে তুলে পরিবারের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগির স্বপ্ন দেখেছিলেন তারা। কিন্তু সেই স্বপ্ন এখন হতাশায় পরিণত হয়েছে। অনেকে পচে যাওয়া খড় থেকে বিবর্ণ ধান বের করছেন, যা মানুষের খাবার হিসেবে নয়, হাঁসের খাদ্য হিসেবেই হয়তো বিক্রি হবে।

বানিয়াচং উপজেলার কৃষক পরিবারের তরুণ সালমান ফারসি বলেন, তাঁদের ৪ কিয়ার জমির ধান পানিতে তলিয়ে যায়। এক কিয়ার জমি থেকে যে ধান পাওয়া গেছে, তা খাওয়ার উপযোগী নয়। হাঁসের খাবার হিসেবেই সেগুলো রাখা হচ্ছে। আজমিরীগঞ্জ পৌরসভার ফতেহপুর এলাকার বর্গাচাষি জিয়াউল মিয়া এবার হাইট্টার হাওরে ১১ কিয়ার জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। বৈশাখের আকস্মিক বৃষ্টিতে চার কিয়ার জমির ধান ডুবে যায়। পরে সাঁতারপানি থেকে শ্রমিক দিয়ে ধান কাটিয়ে আনলেও ক্ষতি পুষিয়ে ওঠার সম্ভাবনা নেই। তিনি জানান, গত বছর এসব জমি থেকে প্রায় ৩০০ মণ ধান পেয়েছিলেন। এবার ৩০ মণ ধানও হবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান। জিয়াউল মিয়া বলেন, ধান কাইট্টাও লস। নিঃস্ব হয়ে গেছি। যে ট্যাকা খেতে খরচ, তাও উঠত না। অদূরে মলিন ধান শুকাচ্ছিলেন তাঁর স্ত্রী জেসমিন আক্তার। পাশে ঘুরছিল তিন শিশু সন্তান। ঈদে নতুন জামা পেয়েছে কি না জানতে চাইলে শিশুরা নিশ্চুপ থাকে। জেসমিন আক্তার বলেন, “আল্লাহ আমরার ঈদ নিসেগা ইবার। সব গেহস্ত মরা ইবার।” জিয়াউল যোগ করেন, “ঈদে এক কেজি তেল আনার মতো পয়সা পর্যন্ত তো নাই।”

সম্প্রতি হবিগঞ্জ সদর, বানিয়াচং ও আজমিরীগঞ্জ উপজেলার অন্তত ৩০টি কৃষক পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবারের বৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলের প্রায় সব কৃষকই ক্ষতির মুখে পড়েছেন। ভাটি এলাকার অনেক কৃষক পুরো ফসল হারিয়েছেন। আবার যাঁরা পানির নিচ থেকে ধান তুলতে পেরেছেন, তাঁদেরও খরচ উঠছে না।

আজমিরীগঞ্জ উপজেলার জলসুখা এলাকার কৃষক মনির মিয়া জানান, পুবেরবন হাওরে তাঁর ৬ কিয়ার জমি ছিল। গত বছর সেখান থেকে ১২০ মণ ধান পেয়েছিলেন। এবার অতিবৃষ্টির কারণে ৭০ মণ ধানও হবে কি না, তা নিয়ে শঙ্কায় আছেন তিনি। অন্যদিকে আজমিরীগঞ্জ সদর ইউনিয়নের বিরাট এলাকার কৃষক অলি মিয়া সড়কের পাশে ১ হাজার টাকা মণ দরে কাঁচা ধান বিক্রি করছিলেন। তিনি বলেন, “আমার গেহস্তি নষ্ট হইছে। বৃষ্টির লাগি অনেক ধান কাটতি পারি নাই। যে ধান কাটছি, এতে নিজেরারই কিছু হইতো না।

এদিকে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তথ্য সংগ্রহ করে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ে তালিকা পাঠিয়েছে হবিগঞ্জ জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জেলার ৯ উপজেলার মোট ২২ হাজার ৩৭৩ জন কৃষকের তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তাদের ক, খ ও গ তিন শ্রেণিতে ভাগ করে সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। তালিকা অনুযায়ী সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক রয়েছেন বানিয়াচং উপজেলায়। এখানে ক্ষতিগ্রস্তের সংখ্যা ৭ হাজার ৮৮৫ জন। এছাড়া নবীগঞ্জে ৩ হাজার ৬৫২ জন, লাখাইয়ে ৩ হাজার ৩৫০ জন, আজমিরীগঞ্জে ৩ হাজার ৮৫ জন, বাহুবলে ১ হাজার ৮৯৫ জন, শায়েস্তাগঞ্জে ৮০০ জন, মাধবপুরে ৬৩০ জন, হবিগঞ্জ সদরে ৬৪৪ জন এবং চুনারুঘাটে ২৬১ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।

তবে অনেক কৃষকের অভিযোগ, রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকের নাম তালিকায় ওঠেনি। বানিয়াচংয়ের দক্ষিণ-পূর্ব ইউনিয়নের চান্দের মহল্লার কৃষক আবদুর রব বলেন, সরহারি এক্টা ই আছে, ইতাও পাইছি না আমি। আমরার বিরুদ্ধ হেরা, তাই নামটাম নিসে না। একমাত্র বোরো ফসল ঘরে তোলার স্বপ্ন দেখলেও শেষ পর্যন্ত অনেক কৃষক খালি হাতে ফিরেছেন। কেউ ঋণ করে বোরো আবাদ করেছিলেন, কেউ নিজের সঞ্চয় খরচ করেছেন। কিন্তু ফসলহানির পর এখন তাঁদের সামনে বড় প্রশ্ন, কীভাবে চলবে সংসার, কীভাবে শোধ হবে এনজিও ও মহাজনের ঋণ। সরকারি সহায়তার আশায় দিন পার করছেন হাওর এলাকার হাজারো কৃষক। তাঁদের অনেকেই বলছেন, পুরো ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তবে সামান্য সহায়তাও অন্তত সংকটের সময়ে কিছুটা স্বস্তি এনে দিতে পারে।

কৃষকদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে এমন ক্ষয়ক্ষতি তাঁরা দেখেননি। তাই প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত সব কৃষককে সরকারি সহায়তার আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তারা। আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কৃষক ভাই জুয়েল চৌধুরী ও ওয়াশিক চৌধুরী বলেন, “এবার কৃষকের মরার বছর। সব কৃষি উপকরণের দাম বেশি। ধানের দামও খুব কম। সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্ট হবিগঞ্জ শাখার সদস্য শফিকুল ইসলাম বলেন, ক্ষতি দল-মত দেখে হয়নি। তাই সব ক্ষতিগ্রস্ত কৃষককে সহায়তার আওতায় আনতে হবে এবং কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।

এ বিষয়ে হবিগঞ্জের ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা পাঠানো হয়েছে। বরাদ্দ পাওয়া গেলে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সহায়তা প্রদান করা হবে। তালিকা থেকে কেউ বাদ পড়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করে তথ্য যাচাইয়ের সুযোগও থাকবে বলে জানান তিনি।

Development by: webnewsdesign.com