ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরুর প্রাথমিক দিনগুলোতে দেশটির সর্বোচ্চ নেতাসহ শীর্ষ কর্মকর্তাদের ইসরাইলি হামলায় নিহত হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেছিলেন, ইরানের ভেতর থেকে ‘কেউ একজন’ দেশের দায়িত্ব নিলে সবচেয়ে ভালো হবে।
তবে এখন জানা গেছে, যুদ্ধ শুরুর সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মনে বিশেষ একজনের নাম ছিল, তিনি হলেন ইরানের সাবেক কট্টরপন্থি, ইসরাইল ও আমেরিকাবিরোধী প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদ।
মার্কিন কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানা গেছে, ইসরাইলিদের তৈরি করা এই দুঃসাহসিক পরিকল্পনা সম্পর্কে আহমাদিনেজাদের সঙ্গে পরামর্শও করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পনাটি দ্রুত ভেস্তে যায়।
মার্কিন কর্মকর্তা এবং আহমাদিনেজাদের এক সহযোগী জানিয়েছেন, যুদ্ধের প্রথম দিন তেহরানে আহমাদিনেজাদের বাড়িতে ইসরাইলি হামলায় তিনি আহত হন। মূলত তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যে ইসরাইলি বিমানবাহিনী এই হামলা চালিয়েছিল। তিনি হামলা থেকে বেঁচে গেলেও এ ঘটনার পর শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের পরিকল্পনা নিয়ে তার মোহভঙ্গ হয়। এরপর থেকে তাকে আর প্রকাশ্যে দেখা যায়নি।
২০০৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট থাকাকালীন ইসরাইলকে ‘মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার’ আহ্বান জানানো আহমাদিনেজাদকে এই পরিকল্পনার জন্য বেছে নেওয়া ছিল অত্যন্ত অভাবনীয়। ইরানের পরমাণু কর্মসূচির কট্টর সমর্থক ও অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমনকারী আহমাদিনেজাদকে কীভাবে এই পরিকল্পনায় রাজি করানো হয়েছিল, তা এখনো অজানা।
ইসরাইল কর্তৃক ইরানের ধর্মীয় সরকার পতনের বহুমুখী পরিকল্পনার অংশ ছিল এটি। হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি এই রেজিম চেঞ্জ পরিকল্পনা ও আহমাদিনেজাদ সম্পর্কে সরাসরি মন্তব্য না করে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’র লক্ষ্যগুলোর বিষয়ে স্পষ্ট ছিলেন। এছাড়া ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করা, উৎপাদন কেন্দ্র ভেঙে দেওয়া, তাদের নৌবাহিনীকে ডুবিয়ে দেওয়া এবং তাদের প্রক্সি বা সহযোগীদের দুর্বল করাও ছিল ট্রাম্পের পরিকল্পনা অংশ। মার্কিন সামরিক বাহিনী তার সব লক্ষ্য অর্জন করেছে।’
যুদ্ধ শুরুর প্রথম দিন ইসরাইলি হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হন। সেন্ট্রাল তেহরানে খামেনির কম্পাউন্ডে চালানো ওই হামলায় ইরানের একটি সরকারি বৈঠকও ধ্বংস হয়ে যায়, যেখানে হোয়াইট হাউসের চিহ্নিত করা এমন কিছু কর্মকর্তা নিহত হন যারা সরকার পরিবর্তনে আলোচনার বিষয়ে আগ্রহী ছিলেন।
প্রথমে ইরানি গণমাধ্যমে আহমাদিনেজাদের মৃত্যুর খবর এলেও পরবর্তীতে জানা যায় তিনি বেঁচে আছেন, তবে তার বাড়ি পাহারা দেওয়া ও তাকে গৃহবন্দী করে রাখা ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড কোরের (আইআরজিসি) সদস্যরা নিহত হয়েছেন।
মার্চ মাসে ‘দ্য আটলান্টিক’ ও পরবর্তীতে ‘দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস’-এর প্রতিবেদনে আহমাদিনেজাদের সহযোগীরা নিশ্চিত করেছেন, ওই হামলাটিকে মূলত একটি ‘জেলব্রেক’ বা মুক্ত করার অভিযান হিসেবে দেখা হয়েছিল।
আহমাদিনেজাদ সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইরানের বর্তমান শাসনব্যবস্থার দুর্নীতি ও কুশাসনের তীব্র সমালোচনা করে আসছিলেন, যার কারণে ২০১৭, ২০২১ ও ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তার প্রার্থিতা বাতিল করে ইরানের গার্ডিয়ান কাউন্সিল। তার পূর্ববর্তী প্রধান স্টাফ এসফান্দিয়ার রহিম মাশাইয়ের বিরুদ্ধে ২০১৮ সালে ব্রিটিশ ও ইসরাইলি গোয়েন্দা সংস্থার হয়ে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া ২০২৩ সালে গুয়াতেমালা এবং ২০২৪ ও ২০২৫ সালে হাঙ্গেরি (যাদের সঙ্গে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে) সফরে যান আহমাদিনেজাদ। গত জুনে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার রহস্যজনক নীরবতা লক্ষ্য করা গিয়েছিল।
ইসরাইলের পরিকল্পনা ছিল বিমান হামলা, সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যা এবং কুর্দিদের সমাবেশের মাধ্যমে ইরানে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা তৈরি করে বিদ্যুৎ গ্রিডের মতো অবকাঠামো ধ্বংসের মাধ্যমে সরকারের পতন ঘটানো এবং একটি ‘বিকল্প সরকার’ প্রতিষ্ঠা করা। তবে বিমান হামলা ও সর্বোচ্চ নেতাকে হত্যার বাইরে এই পরিকল্পনার খুব কমই বাস্তবায়িত হয়েছে, যা ইরানের স্থিতিস্থাপকতা বুঝতে মার্কিন ও ইসরাইলি কর্মকর্তাদের ব্যর্থতাকে ফুটিয়ে তোলে।
মোসাদের প্রধান ডেভিড বার্নিয়া অবশ্য তার সহযোগীদের কাছে এখনো দাবি করছেন, অনুমোদন পেলে এই পরিকল্পনা সফল হওয়ার ভালো সম্ভাবনা ছিল।
সূত্র: দ্য নিউইয়র্ক টাইমস
Development by: webnewsdesign.com