তরুণদের পদচারণায় মুখর বইমেলা

মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ ২০২২ | ৯:৪৫ অপরাহ্ণ

তরুণদের পদচারণায় মুখর বইমেলা
apps
তরুণ পাঠকদের পদচারণায় মুখরিত অমর একুশে গ্রন্থমেলা। প্রাণের বইমেলায় তরুণ পাঠকরাই সবচেয়ে বেশি বই কেনেন বলে মনে করেন প্রকাশকরা। সৃষ্টিসুখের ভাগীদার হতে তরুণ বইপ্রেমীরা খুঁজে ফেরেন বৈচিত্র্যপূর্ণ লেখা। গ্রন্থমেলায় আগত পাঠকদের অধিকাংশই বয়সে তরুণ। তাদের পছন্দের তালিকায় শীর্ষে রয়েছে থ্রিলার, উপন্যাস, অনুবাদ সাহিত্য ও নতুন লেখকদের বই।
চোখে-মনে যারা জ্ঞানের আলো জ্বেলে রাখতে চান, সেই তরুণরা বইমেলায় আসেন প্রাণের কল্লোল নিয়ে। সৃষ্টিসুখের উল্লাসে নতুনত্বের প্রয়াসে আসেন বিষয় বৈচিত্র্যের বই খুঁজে খুঁজে নিতে। মেলা যখন উত্তাল মার্চে, তখন মেলা অঙ্গনজুড়ে দেখা তরুণ পাঠকদের উপস্থিতি বেশি পাওয়া গেল।
এক তরুণী বলেন, ‘গল্প, উপন্যাস, কবিতা–সব ধরনের বই পড়তে ভালো লাগে। কয়েকজন তরুণ খুব ভালো লেখালিখি করছেন। তাদের সবার বই পড়ার চেষ্টা করি।’ তরুণ পাঠকরা কেউ কেউ বেছে নিচ্ছেন থ্রিলার, কারও আবার পছন্দ উপন্যাস। তবে, তরুণদের চাহিদার শীর্ষে আছেন হুমায়ূন আহমেদ ও জাফর ইকবালের বই। লেখকরাও তরুণদের সরব উপস্থিতিকে ইতিবাচকভাবেই দেখছেন। এক লেখিকা বলেন, ‘কবিতাগুলো অনুভূতি নিয়েই তুলে ধরার চেষ্টা করি। এখনকার প্রজন্মের তরুণদের অনুভূতির সঙ্গে আসলে মিলে যায়।’ সাহ্যিত্যের সব মাধ্যমের প্রতি তরুণদের আগ্রহ বইমেলাকে যেমনিভাবে মুখরিত করেছে, তেমনি এক নতুন সম্ভাবনাময় বাংলাদেশের হাতছানি দিচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী স্মিতা জান্নাত বাণিজ্য প্রতিদিনকে বলেন, থ্রিলার বই বরাবরই রোমাঞ্চকর। পুরো বইটা এক নিমিষে পড়ার ইচ্ছা জাগে। মানুষকে বিমুগ্ধ করে রাখে। আমার কাছে গল্প-উপন্যাসের চেয়ে থ্রিলার বই পছন্দের। সমসাময়িক থ্রিলারদের মধ্যে মোহাম্মদ নাজিম উদ্দিনের রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনও খেতে আসেননি আমার ভালো লেগেছে। তাই বইমেলায় থ্রিলার টাইপ বইয়ের খোঁজ করছি।
গল্প, উপন্যাস, কবিতার পাশাপাশি বর্তমানে উঠতি বয়সের তরুণ-তরুণীদের থ্রিলার বইয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে বলে মনে করছেন প্রকাশকরা।
শিখা প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী রিয়া বলেন, আমাদের সবচেয়ে বেশি বিক্রি হচ্ছে থ্রিলার বই। বনানী কবরস্থান বইটা সর্বাধিক বিক্রি হয়েছে। এছাড়া ব্ল্যাকমুনসহ আমাদের চারটি থ্রিলার বই রয়েছে। যা তরুণদের বেশি আকৃষ্ট করছে।
তাম্রলিপি প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী মাহবুবুর রহমান রুমাত বলেন, তরুণরা বর্তমানে থ্রিলার বইয়ের প্রতি বেশি ঝুঁকছে। বিশেষ করে কিশোরীরা যারা ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত তারা বেশি ভূতের গল্প, বিভিন্ন রোমাঞ্চকর বই ব্যাপকভাবে কিনছেন। আমাদের সাদমান সাঈদ চৌধুরীর মনশ্চক্ষু, মালিহা তাবাসসুমের অ্যাকিলিসের টেন্ডন নামের মেডিক্যাল থ্রিলার বই বেশি বিক্রি হচ্ছে।
আদর্শ প্রকাশনীর বিক্রয়কর্মী আব্দুল মঈন খান বলেন, আমাদের থ্রিলারধর্মী বই কম। মাইন্ড ট্রাভেল নামে একটি বই আছে যা তরুণদের মধ্যে চাহিদা রয়েছে। বইমেলার পাশাপাশি অনলাইনেও এসব থ্রিলারধর্মী বইয়ের চাহিদা টপ ক্যাটাগরিতে থাকছে। থ্রিলার প্রকৃতির বই ‘হিমলুং শিখরে’র লেখক ইকরামুল হাসান শাকিল বলেন, আমার এ বইটা রকমারিতে থ্রিলার ক্যাটাগরিতে টপ ফাইভে আছে। অনলাইনে এর অনেক প্রচারণা হয়েছে। এ বইয়ে গতানুগতিক থ্রিলার বইয়ের বাইরে গিয়ে নতুন অনেক কিছু আমি সন্নিবেশিত করেছি।
বইমেলায় গাজীপুরের হারবাইদ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে বই কিনতে এসেছেন দশম শ্রেণির বিজ্ঞান বিভাগের তিন বন্ধু। তাদের দুজন আরিফুল ইসলাম ও নূর মোহাম্মদ বলেন, বইয়ের প্রতি আমাদের অন্য রকম টান আছে। সব ধরনের বই পড়ি। নিজের মতো করে চিন্তা করতে পারি বই পড়ার মধ্যে। সায়েন্স ফিকশান, থ্রিলার বইয়ের প্রতি আমাদের আগ্রহ রয়েছে।
ইকবাল হাসান নামে এক সরকারি কর্মকর্তা বলেন, আজ আমার সাপ্তাহিক বন্ধ থাকায় বইমেলা চলে আসলাম। অনেক ভিড় হবে জেনেও এসেছি। বইমেলা আমার প্রাণের মেলা হলেও সব সময় আসার সুযোগ হয়না। আজকে ছুটির দিন পাওয়ায় উৎফুল্ল মনে চলে এসেছি। এবারের মেলায় গতবারের চেয়ে অনেকটাই পরিবেশবান্ধব। তাই এসে ভালো লাগছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইদানীং এই তরুণদের একটি বড় অংশই বইমেলায় আসেন বিভিন্ন ফেসবুক সেলিব্রেটির বই কিনতে; যাদের বেশিরভাগই মূলত লেখক নন। গতকাল মঙ্গলবার বিকালে এমন বক্তব্যের প্রমাণ মিললো রাজধানীর মিরপুর থেকে বইমেলায় আসা এক তরুণের (নাম প্রকাশ করা হলো না) বক্তব্যে। পছন্দের বই সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি আসলে বই তেমন পড়ি না। আমার প্রিয় একজন ফেসবুক সেলিব্রেটি বই লিখেছেন, সেই ভালোলাগা থেকে কিনলাম।’
প্রকাশকরা বলছেন, এই শ্রেণির তরুণ পাঠকরা আসলে ‘বই’ পড়েন না, ‘লেখক’ পড়েন। আর এধরনের পাঠকসমাজের কারণে অনেক সময় মূলধারার লেখকরা অবহেলিত হচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, যারা মূলত পাঠক তারা মূল ধারার লেখকদের বই-ই কেনেন এবং পড়েন। আর যারা শুধু ফেসবুক সেলিব্রেটিদের বই কেনেন, তারা আবেগের জায়গা থেকেই কেনেন, অনেক সময় সেই বই পড়েনও না।
ভাষাচিত্র প্রকাশের প্রধান সম্পাদক খন্দকার সোহেল বলেন, ‘বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিচিত মুখ, ইউটিউবাররা ইদানীং বই লিখছেন আর তাদের ফ্যান-ফলোয়াররা এসে বই কিনছেন। এমনফ্যান-ফলোয়ার যারা বই কেনেন, আমরা (প্রকাশক) তাদের সেভাবে মূল্যায়নও করি না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক প্রকাশক বলেন, সেলিব্রেটিদের বইলেখায় দোষের কিছু নেই। তবে সেই বই কতটা মানসম্পন্ন সেটা বিবেচ্য। শুধু ফেসভেল্যুর কারণে বই বিক্রি বেড়ে যাওয়া, আর মূলধারার লেখকদের জ্ঞানগর্ভ বই অবহেলিত হওয়াটা দোষের। এসব পরিবর্তন করতে হলে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যাভ্যাস গড়ে তুলতে হবে। এর দায়িত্ব পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সকলের।
বাংলা প্রকাশের মার্কেটিং সিনিয়র এক্সিকিউটিভ নুরুন্নবী বলেন, ‘বইমেলায় সবধরনের পাঠকই আসেন, তবে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী বিশেষ করে তরুণ পাঠকের সংখ্যাই বেশি। এই তরুণ পাঠকদের পছন্দের তালিকায় এগিয়ে রয়েছে থ্রিলার, অনুবাদ সাহিত্য, উপন্যাস। এরমধ্যে একটি বৃহৎ অংশ তরুণ লেখকদের ভক্ত।’
তবে মূলধারার লেখকদের বই কেউই কিনছেন না- এমনটাও নয়। বইমেলার অপেক্ষায় থাকেন একটা পাঠকশ্রেণি, যারা বিভিন্ন প্যাভিলিয়নে গিয়ে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বই কেনেন। এমনই একজন নারায়ণগঞ্জ থেকে আসা পাঠক সামিয়া তাসলিম। তিনি বলেন, ‘আমার উপন্যাস পড়তে ভালো লাগে। হুয়ামুন আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা আমার খুব পছন্দ। তবে নতুন লেখকদের লেখা কয়েকটি বইও এবার কিনেছি, দেখি তাদের লেখা কেমন লাগে!’
অনন্যা প্রকাশের মেলার প্যাভেলিয়ন ইনচার্জ ফারুক বলেন, ‘মেলায় তরুণ পাঠকদের সংখ্যাই বেশি আর তাদের পছন্দের তালিকার প্রথমে রয়েছে উপন্যাস। তরুণদের মধ্যে একটা অংশ আছেন, যারা বিভিন্ন ফেসবুক সেলেব্রিটির ভক্ত। তাই তার বই না কিনলে নয়, এমন ধারণা থেকে বই কেনেন। আসলে এরা শুধু আবেগের জায়গা থেকেই কেনেন, এগুলো তারা পড়েনও না। যারা আসলেই পাঠক তারা এধরনের বই খোঁজেন না, তারা মূলধারার লেখকদের বই কেনেন এবং পড়েন।’

Development by: webnewsdesign.com