বঞ্চনার অধিকারে রংপুর-৩ এ ভোটযুদ্ধে তৃতীয় লিঙ্গের -রানী

শনিবার, ০৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ২:৩০ অপরাহ্ণ

বঞ্চনার অধিকারে রংপুর-৩ এ ভোটযুদ্ধে তৃতীয় লিঙ্গের -রানী
apps

নেতিবাচক সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে আবারও ভোটের মাঠে নেমেছেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। আসন্ন গণভোট ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সারা দেশে হিজড়া জনগোষ্ঠী থেকে একমাত্র প্রার্থী হিসেবে রংপুর-৩ (সদর) আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তিনি। তার নির্বাচনী প্রতীক হরিণ।

বিভাগীয় নগরী রংপুরের গুরুত্বপূর্ণ এই আসনে আটজন প্রার্থীর মধ্যে রানী ভোটারদের কাছে পরিচিত মুখ। এর আগেও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় তার রাজনৈতিক উপস্থিতি নতুন নয়। ভিন্ন লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে তার অংশগ্রহণ ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে বাড়তি কৌতূহল ও আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে।

ভোটের মাঠে রানীর উপস্থিতি আলাদা করে নজর কাড়ছে। প্রায় ৩৮ লাখ টাকার গাড়িতে চলাফেরা, পরিপাটি পোশাকআশাক ও আত্মবিশ্বাসী কথাবার্তায় ভোটারদের আকৃষ্ট করার চেষ্টা করছেন তিনি। বিশেষ করে তরুণ ভোটারদের মধ্যে তার প্রচারণা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

সবশেষ ২০২৪ সালের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোটের ফলাফলেও চমক দেখিয়েছিলেন আনোয়ারা ইসলাম রানী। ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের ৮১ হাজার ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। ঈগল প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে রানী পান ২৩ হাজার ভোট, যা তাকে নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বীতে পরিণত করে।যদিও সে সময় আওয়ামী লীগের সঙ্গে আসন সমঝোতার মাধ্যমে জাতীয় পার্টি জয়ী হয়েছিল বলে দাবি ওঠে।

প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মৌলিক অধিকার ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে এবারও মাঠে আছেন রানী। তার এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে শুধু নির্বাচন নয়, বরং সাহস ও চ্যালেঞ্জের প্রতীক হিসেবে দেখছেন জেন্ডার বিশেষজ্ঞরা।

সম্প্রতি নির্বাচনী পরিবেশ ও প্রস্তুতি নিয়ে আনোয়ারা ইসলাম রানীর সঙ্গে কথা হয়। তিনি জানান, জীবনের শুরু থেকেই লিঙ্গ পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। ছোটবেলার স্মৃতি তুলে ধরে রানী বলেন,মেয়েরা আমাকে খেলায় নিত না, বলত তুই ছেলেদের মতো। আবার ছেলেরাও নানা কটু মন্তব্য করত। চরম প্রতিকূল পরিবেশে আমার শৈশব-কৈশোর কেটেছে।”

সমাজের এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের লক্ষ্যেই ২০০৯ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন ‘ন্যায় অধিকার তৃতীয় লিঙ্গ উন্নয়ন সংস্থা’। এই সংগঠনের মাধ্যমে হিজড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য কাজ করছেন তিনি। তার উদ্যোগে ইতোমধ্যে প্রায় ৪০০ মানুষের মধ্যে ৬০ জনের কর্মসংস্থান এবং ৩২ জনের পড়াশোনার ব্যবস্থা হয়েছে।

রানীর বক্তব্য.বেদে, দলিত, সাঁওতাল, হিজড়া, সনাতন ও উর্দুভাষী জনগোষ্ঠী ভোট দেয়, কিন্তু সংসদে গিয়ে কেউ আমাদের কথা বলে না। আমি চাই এসব প্রান্তিক মানুষের মুখপাত্র হতে।”

নির্বাচিত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ও নিরাপত্তাসহ মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণে কাজ করার অঙ্গীকার করেন তিনি। পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, রংপুর মহানগরীর শ্যামাসুন্দরী খাল দখলমুক্ত করে পরিকল্পিত নগরায়ণ, গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নে ভূমিকা রাখতে চান।

৩৩ বছর বয়সী আনোয়ারা ইসলাম রানী অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন। রংপুর নগরীতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা তার। বাবা মো. চাঁন মিয়া ছিলেন মোটরশ্রমিক এবং মা জুলেখা বেগম গৃহিণী।

ভোটের পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন,সব প্রার্থীর জন্য পরিবেশ এখনো সমান নয়। অনেক জায়গায় আতঙ্ক আছে, বিশেষ করে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা কাজ করছে।

ভোটারদের উদ্দেশে রানীর আবেদন,আমি কোনো দলের কাছে দায়বদ্ধ নই, আমার কোনো পিছুটানও নেই। মানুষ হিসেবে একবার সুযোগ দিয়ে আমাকে পরখ করে দেখতে পারেন।

Development by: webnewsdesign.com