ঢাকার রেস্টুরেন্টে হাইজিন : সমস্যাটা কোথায়, দায় কার?

শুক্রবার, ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | ৭:০৪ অপরাহ্ণ

ঢাকার রেস্টুরেন্টে হাইজিন : সমস্যাটা কোথায়, দায় কার?
apps

ঢাকার রেস্টুরেন্ট শিল্প গত এক দশকে অভূতপূর্বভাবে বিস্তৃত হয়েছে। আজ শহরের প্রায় প্রতিটি এলাকায় রেস্টুরেন্ট রয়েছে-ছোট, মাঝারি ও বড়; দেশি ও বিদেশি; ফাস্টফুড থেকে শুরু করে ফাইন ডাইনিং। এই বিস্তার নিঃসন্দেহে নগরজীবনের একটি ইতিবাচক পরিবর্তন। কিন্তু একই সঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্নও উঠে আসে-এই দ্রুত বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে কি হাইজিন ও খাদ্য নিরাপত্তার মানও সমানভাবে উন্নত হয়েছে?

বাস্তবতা হলো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে তা হয়নি। অভিজ্ঞতা ও বিভিন্ন পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, ঢাকার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রেস্টুরেন্টে এখনও বেসিক হাইজিন মানদণ্ড যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয় না। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে ভোক্তার স্বাস্থ্যের ওপর এবং পরোক্ষভাবে পুরো রেস্টুরেন্ট শিল্পের বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর।

এই সমস্যার প্রথম ও প্রধান কারণ প্রশিক্ষণের অভাব। অনেক রেস্টুরেন্ট মালিক বা ব্যবস্থাপক ব্যবসা পরিচালনায় দক্ষ হলেও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত ধারণা রাখেন না। রান্নাঘরের পরিচ্ছন্নতা, কাঁচামালের সঠিক সংরক্ষণ, কোল্ড চেইন বজায় রাখা, কর্মীদের ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি-এই মৌলিক বিষয়গুলো প্রায়ই অবহেলিত থাকে। অথচ এসবই একটি রেস্টুরেন্টের মান ও নিরাপত্তার ভিত্তি।

দ্বিতীয় বড় সমস্যা মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার অনুপস্থিতি। ঢাকার অধিকাংশ রেস্টুরেন্টেই নিয়মিত অভ্যন্তরীণ পরিদর্শন বা নির্ধারিত স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর অনুসরণ করা হয় না। ফলে রান্নার পানি, কাঁচামাল কিংবা প্রস্তুত খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক ক্ষেত্রে মালিক নিজেও জানেন না, প্রতিদিন তার রেস্টুরেন্টে কীভাবে খাবার প্রস্তুত ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা প্রয়োজন-এই সংকটের জন্য শুধু রেস্টুরেন্ট মালিকদের দায়ী করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। ভোক্তার ভূমিকাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা সাধারণত রেস্টুরেন্ট বাছাই করি খাবারের স্বাদ, পরিবেশ কিংবা সামাজিক জনপ্রিয়তার ভিত্তিতে। কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই হাইজিন বা খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করি। সচেতন ভোক্তার অভাব রেস্টুরেন্ট মালিকদের ওপর মান বজায় রাখার চাপও কমিয়ে দেয়।

সমাধান তাই একমুখী নয়। রেস্টুরেন্ট মালিকদের অবশ্যই কর্মীদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরিষ্কার মানদণ্ড এবং কার্যকর অভ্যন্তরীণ মান নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। আন্তর্জাতিকভাবে উন্নত রেস্টুরেন্ট শিল্পে হাইজিন কোনো ঐচ্ছিক বিষয় নয়-এটি একটি বাধ্যতামূলক ব্যবসায়িক শর্ত। একই সঙ্গে খাদ্য নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর দায়িত্ব হলো বাস্তবসম্মত ও কার্যকর ন্যূনতম হাইজিন মানদণ্ড নির্ধারণ এবং তার প্রয়োগ নিশ্চিত করা।

ভোক্তা হিসেবেও আমাদের দায়িত্ব কম নয়। খাবারের স্বাদ ভালো হলেই সব ঠিক-এই মানসিকতা থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। পরিষ্কার পরিবেশ, কর্মীদের স্বাস্থ্যবিধি ও খাবারের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন করা আমাদের নাগরিক অধিকার। সচেতন ভোক্তাই একটি শিল্পকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, ঢাকার রেস্টুরেন্ট শিল্পের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে শুধু নতুন রেস্টুরেন্ট খোলার ওপর নয়, বরং বিদ্যমান রেস্টুরেন্টগুলো কতটা দায়িত্বশীলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করছে তার ওপর। স্বাস্থ্যসম্মত খাবার কোনো বিলাসিতা নয়-এটি নাগরিক অধিকার। এই অধিকার রক্ষা করা মালিক, নিয়ন্ত্রক সংস্থা ও ভোক্তা-তিন পক্ষের সম্মিলিত দায়িত্ব।

লেখক :
রনিত কুমার রায়
শিক্ষার্থী
আইন বিভাগ, লন্ডন কলেজ অব লিগ্যাল স্টাডিজ (সাউথ), ইউনিভার্সিটি অব লন্ডন।

Development by: webnewsdesign.com