আমার সন্তান-আমার পৃথিবী,

রংপুরে বিশেষ শিশুদের নিয়ে আনন্দঘন পিঠা উৎসব

শনিবার, ০৬ ডিসেম্বর ২০২৫ | ৩:১৭ অপরাহ্ণ

রংপুরে বিশেষ শিশুদের নিয়ে আনন্দঘন পিঠা উৎসব
apps

আমার সন্তান-আমার পৃথিবী”-এই মানবিক ও অনুপ্রেরণামূলক স্লোগানকে সামনে রেখে রংপুরে অনুষ্ঠিত হলো প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে আয়োজন করা বর্ণিল ও হৃদয়ছোঁয়া ‘পিঠা উৎসব।নিউরো-ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (NDDC),রংপুর এবং বিশেষ শিশু সহায়তা কেন্দ্র ‘প্রেরণাই শক্তি’-এর যৌথ ব্যবস্থাপনায়।

শনিবার (৬ডিসেম্বর) সকালে রংপুর নগরীর অটিজম হোম প্রাঙ্গণ দেওডোবা ডাঙ্গীরপার এলাকায় একটি ভবনে অনুষ্ঠিত হলো প্রতিবন্ধী ও বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের নিয়ে আয়োজন করা বর্ণিল ও হৃদয় ছোঁয়া ‘পিঠা উৎসব।

উৎসবস্থলে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে রঙিন বেলুনে সাজানো প্রবেশপথ, শিশুদের আঁকা পোস্টার, খেলাধুলার নানা উপকরণ, সৃজনশীল দেয়ালচিত্র এবং বিশেষ শিশুদের হাসিখুশি মুখ। প্রাঙ্গণে একত্রিত হন শতাধিক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশু, তাদের অভিভাবক, থেরাপিস্ট, শিক্ষক ও স্বেচ্ছাসেবকরা।উৎসবটি শুধু পিঠা খাওয়ার অনুষ্ঠান নয়; বরং এটি শিশুদের সামাজিক সম্পৃক্ততা, আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি, এবং মানসিক বিকাশে কার্যকর এক বন্ধুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়।

নিউরো-ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজেবিলিটি ম্যানেজমেন্ট সেন্টার (NDDC) কর্মকর্তারা বলেন প্রায় ৬ হাজার রংপুর বিশেষ শিশুদের চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন।এর মধ্যে প্রায় সাড়ে ৩শ শিশু প্রতিদিন চিকিৎসা নিচ্ছেন।

অনুষ্ঠানের শুরুতে এনডিডিসির কর্মকর্তারা বলেন-বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশের জন্য শুধু চিকিৎসা বা থেরাপি যথেষ্ট নয়। তাদের হাসতে শেখানো, খেলতে সুযোগ দেওয়া, সমাজের সঙ্গে যুক্ত রাখা-এগুলোই তাদের অগ্রগতির মূল শক্তি।

আয়োজকরা জানান, সমাজে এখনও প্রতিবন্ধী শিশুদের নিয়ে ভুল ধারণা রয়েছে। এসব ভুল ধারণা দূর করতে এবং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে সচেতনতামূলক এমন উৎসব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তারা বলেন-সচেতনতা বাড়লেই পরিবার ও সমাজ বিশেষ শিশুদের পাশে আরও আন্তরিকভাবে দাঁড়াবে। উৎসবটি সেই ইতিবাচক পরিবর্তনের পথকে আরও প্রশস্ত করবে।”

উৎসবে শিশুদের জন্য আয়োজন করা হয়-স্পিচ থেরাপি-বিহেভিয়ার থেরাপি-অকুপেশনাল থেরাপ- অটিজম সচেতনতামূলক আলোচনা
থেরাপিস্টরা অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলেন শিশুদের আচরণগত সমস্যা, খাদ্যাভ্যাস, ঘরোয়া থেরাপি কৌশল, যোগাযোগ দক্ষতা ও দৈনন্দিন রুটিন তৈরির বিষয়ে।

একজন মা আবেগভরা কণ্ঠে বলেন অনেক জায়গায় আমাদের সন্তানরা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। কিন্তু এখানে এসে ও হাসছে, দৌড়াচ্ছে, খেলছে-মনে হয় ওর পৃথিবিটা নতুন করে পেলাম।”

আরেক অভিভাবক বলেন-এ ধরনের উৎসব আমাদের মানসিক শক্তি জোগায়। আমরা বুঝতে পারি-আমরা একা নই, আমাদের মতো আরও পরিবার আছে যারা একই পথ চলছে।”

ভাপা,পাটিসাপটা,চিতই, দুধচিতই, নারিকেল পুলি, খাজাসহ নানারকম দেশি পিঠার স্টল শিশুদের আকৃষ্ট করে। শিশুরা পিঠার স্বাদ নিতে নিতে অংশ নেয় আঁকিবুঁকি প্রতিযোগিতা, বেলুন খেলা, রঙ মেশানোর মজার কার্যক্রম, মোটর স্কিল উন্নয়নমূলক খেলাসহ নানাবিধ বিনোদনে।

এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন-“অনেক শিশু সাধারণ অনুষ্ঠানে সংকোচবোধ করে। কিন্তু এখানে তারা সবাই নিজের মতো করে খেলছে, হাসছে-এটাই আমাদের সার্থকতা।”

এনডিডিসি রংপুরের কর্মকর্তারা জানান-দেশে বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন শিশুদের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টি, ভুল ধারণা দূর করা এবং পরিবারকে শক্তিশালী করা জরুরি। থেরাপির পাশাপাশি সামাজিক সম্পৃক্ততা তাদের পুনর্বাসনের বড় অংশ।”

তারা আরও জানান, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে এ উৎসব আয়োজন, থেরাপি সুবিধা সহজলভ্য করা এবং বিশেষ শিশুদের জন্য পরিবারকেন্দ্রিক সেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে।

প্রধান অতিথি রংপুর জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপ-পরিচালক অনিল চন্দ্র বর্মন বলেন “বিশেষ শিশুদের উন্নয়নে সরকারি ও বেসরকারি সব প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। সমাজের প্রতিটি মানুষকে তাদের পাশে দাঁড়াতে হবে। এমন উৎসব সমাজে ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করে।

সাবেক কুড়িগ্রাম জেলা সমাজসেবা সহকারী পরিচালক মো. শরিফুল ইসলাম পাইকার বলেন-শিশুরা যখন খেলাধুলা ও আনন্দের মাধ্যমে শিখতে পারে, তখন তাদের অগ্রগতি দ্রুত হয়। এই উৎসব শিশুদের আত্মবিশ্বাস বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”

বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মোহাম্মদ হারুন আর রশিদ বলেন-শিশুর বিকাশ শুধু পরিবার নয়, সমাজের দায়িত্বও বটে। ইতিবাচক পরিবেশ তাদের বিকাশকে ত্বরান্বিত করে।”

বিহেভিয়ার কর্মকর্তা মাহাদী ইসলাম এবং ডাক্তার মো.সামির হোসেন শিমুও শিশুর উন্নয়ন ও থেরাপির গুরুত্ব তুলে ধরেন।অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন এনডিডিসির চেয়ারম্যান আয়েশা সিদ্দীকা।

শেষে অংশগ্রহণকারীদের মাঝে উপহার বিতরণ করা হয়। শিশুদের মুখের হাসিই যেন উৎসবের আসল সার্থকতা।সম্মিলিত ছবিতে বন্দি হয় আনন্দের মুহূর্ত।আয়োজকরা জানান-ভালোবাসা, থেরাপি, সামাজিক অংশগ্রহণ ও আনন্দ-এই চারটি উপাদানই বিশেষ শিশুদের বিকাশে সবচেয়ে কার্যকর শক্তি।

Development by: webnewsdesign.com