কলেজে ভর্তির এক সপ্তাহের মধ্যে আব্বার কাছে বিচার গেল ক্লাশ বাদ দিয়ে রাজনীতি করছি আমি। আব্বা খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলেন। জানালেন, নিয়মিত লেখাপড়া না করলে খরচ দিবেন না। স্কুল মাস্টার বাবাদের এই আদর্শ তখন আমার কাছে একেবারেই যৌক্তিক মনে হয়নি। আমিও সোজাপথে হাঁটার অভ্যাস রপ্ত করিনি। তাই লেখাপড়ার চেয়ে কলেজ সংসদ নির্বাচনকে প্রাধান্য দিই। আব্বা প্রতিশ্রুতি রেখেছেন। পরের মাস থেকে টাকা দেয়া বন্ধ করে দিলেন। হোস্টেলের সিট ভাড়া একবছর না দিলেও কিচ্ছু হয় না জেনে গেছি তখন কিন্তু খাবার খরচ বাকি রাখার সুযোগ নেই। রফিক ভাই পরামর্শ দিলেন লজিং থাকার। কলেজের আশেপাশে তখন জায়গীর মাস্টারের ব্যাপক চাহিদা। বললাম, কলেজের পাশে না হয়ে একটু দূরে হলে আমি রাজী। রফিক ভাই বললেন, সে রকম কোন সুযোগ আসলে প্রথমে তোমাকেই পাঠাবো। সুযোগের প্রতীক্ষায় রইলাম সপ্তাহ খানেক। এক বিকেলে রফিক ভাই ডাকলেন তাঁর কক্ষে। একজন লম্বামতন ভদ্রলোক চেয়ারে বসা। সালাম দিতেই পরিচয় করিয়ে দিলেন, এর কথাই বলছিলাম, ইন্টার কমার্স ফাস্টইয়ারে পড়ে। লোকটা গাইগুই করে বলতে চাইলো, আমি সায়েন্স এর টিচার খুঁজছি। রফিক ভাই একরোখা গোঁয়ারের মত তাকে বলে দিল, আপাতত আমার কাছে আর কোন অপশন নেই। আপনি চাইলে আর কোথাও দেখতে পারেন।লোকটি সেদিন সিদ্ধান্ত না নিয়ে চলে গেলেন। রফিক ভাই আমার উপর কিছুটা বিরক্ত হলেন। আমি কমার্সে ভর্তি হয়ে যেন একটা বিরাট অপরাধ করেছি। পরদিন সকালে আবার রফিক ভাইয়ের ডাক পেলাম। দেখি
আগেরদিনের সেইলোক আবার এসেছেন। বললেন সিক্স আর এইটে কমার্স আলাদা নাই সব একইরকম। তাঁর দুইমেয়েকে আমি যেন যত্ন সহকারে পড়াই। তিনি সেনাবাহিনীর একটা মিশনে কাজ করে দেশে এসেছেন। পরবর্তী নির্দেশনা আসার আগ পর্যন্ত ছুটি। অবসরও হতে পারে আবার মেয়াদও বাড়তে পারে। কথা ফাইনাল করে সেদিন তিনি চলে গেলেন। আমার কানে শুধু একটাই কথা মনে আছে তাঁর গ্রামের নাম কবুতরখোলা। রফিক ভাই বললেন, শুক্রবার থেকে কবুতরখোলায় থাকতে হবে সেই প্রস্তুতি নিতে। কলেজ থেকে কবুতরখোলা খুব বেশি দূরে নয় আবার কাছেও নয়। বর্ষা আর গ্রীষ্মকালের অনেক ফারাক। পদ্মাপাড়ের এই গ্রামের সাথে নদীর মিতালী গড়ে দিয়েছে বিস্তীর্ণ ভাগ্যকুল। বিলের প্রবাহের সাথে নদীর অভিনব মিতালী পেরিয়ে এক বিকেলে আমি আর রফিক ভাই পা রাখলাম কবুতরখোলায়। একটা পাটাতনের ঘরে কাঠের তক্তপোষ, পাশে একটা টেবিল তিনটে চেয়ার। জানলা খুললেই পদ্মার স্নিগ্ধ ফুরফুরে হাওয়া। এক দেখাতেই ভালো লাগার মত পরিবেশ। আমার আনন্দ তখন পদ্মার ঘোলাজলে অবিরাম সাঁতার কাটার মতো ছটফটে
হয়ে উঠছিলো। বাড়ির কর্তার সেনাসদরে তলব পড়েছে। দুই একদিনের মধ্যেই ফিরবেন। রফিক ভাই আমাকে ছাত্রীদের মায়ের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তাঁর মুখের আদল আমার একমাত্র বোনের মতো। মায়াময় হাসিতে তিনি আমাদের একের পর এক খাবার পরিবেশন করছিলেন। এক ফাঁকে তাঁর মেয়েদের ডাকলেন। বাড়ির পাশে পালানে খেলা করছিলেন তারা। মায়ের ডাকে ছুটে এসেছেন। তাদের দেখে রফিক ভাইয়ের চক্ষু
চড়কগাছ। মাস্টারের চেয়ে ছাত্রী বড় হলে পড়াবে কি করে! কিন্তু ওরা স্বপ্রতিভ। নাম জিজ্ঞেস করতেই একসঙ্গে বলে ফেললো মৌরিতানিয়া। বড় জন মৌরী ছোট জন তানিয়া।
রফিক ভাই জিজ্ঞেস করলেন, কিছু বুঝলে? বললাম, আফ্রিকার একটা দেশের নাম। ওদের মা হেসে বললেন, ঠিকই ধরেছেন। জন্মের সময় ওদের বাবা ঐ দেশেই ছিলেন। তাই দুই মেয়ের নাম মিলিয়ে এমন করে রেখেছেন। তাই বলে দুইজনের নাম মিলিয়ে একদেশের নাম! রফিক ভাই আমাকে বারবার বুঝিয়ে বলতে চাইলেন, দেখো তুমি চাইলে লজিং না থেকেও চলে যেতে পারি। এরা বয়সে তোমার কাছাকাছি হবে। আগের ক্লাশে ফেল করে করে এখন সিক্স এইটে পড়ে। এদের পাশ করানো চ্যালেঞ্জ। তুমি ভাই রাজনীতি করা লোক এদের এত সময় দিতে পারবে না। আমি তখন মৌরী তানিয়ার চেয়ে কবুতরখোলা আর পদ্মা নদী নিয়ে
বেশি উচ্ছ্বসিত। রফিক ভাইকে বললাম, আমার আব্বা গরু ছাগলকে পাশ করিয়ে ফেলে আর এরা তো মানুষ। দেখেন কি পড়া শেখাই ফেল করাই ভুলে যাবে চিরতরে। নাস্তা খেয়ে সেদিন আমরা চলে আসি। কথা
হয় পরদিন থেকে আমি ওদের পড়ানো শুরু করব আর কবুতরখোলায় থাকবো। পথে আসতে আসতে রফিক ভাই বারবার আমাকে বুঝাতে চাইল, তিন চার কিলোমিটার পথ রোজ পাড়ি দিয়ে ক্লাশ করা খুব কষ্টকর হয়ে যাবে। আমি নাছোড়বান্দা। লৌহজং সিরাজদিখান থেকে অনেকে রোজ ক্লাশ করে যায় আমি কবুতরখোলা থেকেও পারবো। রফিক ভাই বেশ করে বুঝাতে চাইলেন, সুন্দর মেয়ে দেখে তুমি পটে গেছো। এমন হলে পড়াশুনা হবে না কেবল লজিং লজিং খেলা হবে। বললাম, মেয়েদের চেয়ে আমার কবুতরখোলা গ্রাম ভালো লেগে গেছে। এই লজিং আমি করবোই। রফিক ভাই অনেক করে বুঝালেন। কিন্তু আমার সেসবে মন ভরলো না। পরেরদিন ক্লাশ শেষ হতেই ব্যাগ গুছিয়ে কবুতরখোলা চলে গেলাম। ২১৩ নম্বর আব্দুল হামিদ খান ছাত্রাবাসে তখন মতি ভাই একা থাকবেন। আমাদের ঘটিবাটি কনসার্ট কি হবে জানতে এলো অনেকেই। জানালাম, প্রতিদিন ক্লাশে আসবো দুপুরে খেয়ে দেয়ে কনসার্ট চালাবো।
প্রথম পড়াতে গিয়ে দেখি এরা কথাবার্তায় যেটুকু পটু লেখাপড়ায় এর বিপরীত। মৌরি অপেক্ষা তানিয়া বেশি দুষ্ট। বইয়ের বেশিরভাগ পাতা ছেঁড়া। জিজ্ঞেস করতেই বলে, আমি বড় হয়ে শেরে বাংলা হতে চাই এজন্য মুখস্ত হবার পর পাতা ছিঁড়ে ফেলি। মুখস্থ বলতে বলার পর বলছে, এখন ভুলে গেছি। মৌরি টেবিলের নিচ দিয়ে স্কেল চালান করে দিচ্ছে তানিয়ার কাছে। দুজনে মিলে টেবিলের নিচে কাঠের স্কেল দিয়ে খেলছে। আমার পায়েও লাগছে একটু একটু। কিছুক্ষণ পর ওদের মা নাস্তা নিয়ে এলেন। বললেন, রাতের খাবারটা তাদের সঙ্গে টেবিলে গিয়ে খেয়ে আসলে তিনি খুশী হবেন। আমি নিজেকে তাদের পরিবারের একজন ভাবলে তারা আনন্দিত হবেন। শুরুতেই তাঁকে আপু বলে সম্বোধন করায় তিনি বিস্মিত হলেন। বললেন আগেকার মাস্টারেরা তাঁকে খালাম্মা বলতেন। আমি বললাম, আমার বড়বোন আপনার মতই দেখতে এজন্য বলে ফেলেছি আপনি কিছু মনে করবেন না। তিনি আঁচলের খুঁটে চোখ মুছতে মুছতে বললেন, আমি কিছু মনে করিনি ভাই। বলে চলে গেলেন পলকেই। রাতে খাবার খেতে কেউ ডাকতে এলো না। আমিও কাউকে কিছু বলতে চাইলাম না। তাঁর চোখ ভিজে যাওয়ার তর্জমা করাও তখন শিখিনি। এগারটার দিকে খাবার ট্রে হাতে তিনি আসলেন। বললেন, আমার ভাই তোমার চেয়ে দুই তিন বছরের বড় হবে বাড়ি থেকে অভিমান করে চলে গেছে অনেকদিন। অনেক খুঁজেও তাঁর কোন সন্ধান পাইনি। ওর বয়সী কাউকে দেখলে আমার ভাইয়ের কথা মনে হয়। তুমি আমাকে আপু বলেছ এতেই আমার আনন্দ তাই চোখে পানি চলে এসেছে।
পরদিন সকালে মৌরী তানিয়ার বাবা এলেন ঢাকা থেকে। আমি কলেজে যাবার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলাম। তিনি এসে বললেন, আজ ক্লাশ শেষ করে তাড়াতাড়ি চলে এসো। পদ্মা নদীতে ইলিশ মাছ ধরতে যাবো। কী এক অপার আনন্দে লোকটাকে খুব খুশী খুশী লাগছিলো। বললাম, আমাদের ঘটিবাটি কনসার্ট আছে এরপরই চলে আসবো। দুপুরে কনসার্ট জমলো না। মতি ভাই, কুদ্দুস ভাই সকলের মন খারাপ। হোস্টেলের রান্নার খালা, নাইটগার্ড মালি সকলের এককথা তোমার জায়গীর থাকতে হবে না। আমরা তোমার খাবারের বিল দিয়ে দিব। অল্প টাকা বেতন পেলেও ওরা আমাকে এত ভালবাসে একদিনেই মিস করছে খুব। আমি তখন কবুতরখোলা ছাড়া আর কিছুতেই মন দিতে পারছিলাম না। বললাম, খুব দ্রুতই জায়গীর ছেড়ে হোস্টেলে চলে আসবো। আমার লজিং এর বিষয়ে হোস্টেল সুপার যেন কিছুই না জানে। এইকথা মুখ থেকেও সরেনি দেখি সুপার স্যার আমাদের রুমে। বললেন, তোমার টিউশনি দরকার হলে আমাকে বলতে পারতে। লজিং নিতে গেলে কোন কারণে। তাও কলেজের পাশে হলে মানা যেত। কাল থেকে ওসব বন্ধ। আজকে গিয়ে ওদের কাছে বলে চলে আসবে।
প্রফেসর মন্টু রঞ্জন সাহা হোস্টেল সুপার। আমাদের ম্যানেজমেন্ট পড়ান। ক্লাশের বাইরেও আমাদের দেখভাল করেন। কিন্তু লজিং বিষয়ে তাঁকে এই তথ্য কে দিয়েছে ভাবতে ভাবতে আমি কবুতরখোলা চলে গেলাম। সারয়ার ভাই অপেক্ষা করছেন আজ পদ্মায় ইলিশের নৌকায় চেপে মাছ ধরা দেখবো। ইলিশ মাছের জীবন্ত অবস্থা দেখার তর সইছে না আর। হোস্টেল সুপার সারের কথা ঝেড়ে দিলাম ছুট। গুরুজনের কথা শুরুতে শুনতে অভ্যস্ত হইনি কখনই। আমার জন্য অপেক্ষা করছে মৌরি তানিয়ার বাবা সারয়ার ভাই। বাসায় ঢুকে মুখহাত ধুয়ে চা বিস্কুট খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম ইলিশ অভিযানে। সন্ধে হতে রাত বারোটা পর্যন্ত একটাও মাছ ধরা পড়েনি। নিজেকে কুফা মনে হচ্ছিল যাচ্ছেতাই রকমের। সুকুমারের নৌকায় মাছ একটু দেরিতে উডে এই কথা বলে হেসে হেসে শান্ত থাকছে সারয়ার ভাই। ওরা তামাক টেনে টেনশন কাটাচ্ছে। জালে মাছের কোন নিশানা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশাল জালের কোথাও একটা নাম নাজানা মাছও হাজিরা দিতে চাইছে না। পাশের নৌকার খোঁজ নিচ্ছে জেলেরা। আজ এখনো মাছ পায়নি কেউ।
রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হিম শীতল বাতাস বইতে শুরু করলো। নভেম্বর মাসের এই সময়ে মাছেরা খুব দলবদ্ধ থাকে। এই কথা বলছে জেলেদের একজন। আরেকজন এর সাথে যোগ করে, তাইলে একলগে মরতে আহে আমগো গাঙ্গে! সুকুমার ধমক লাগায় ডাইনে টানো, খালি কতা কয় আর তামাক তুমাক লইয়া গপ মারার তালে থাকে। ইলিশ কি তোগো বিয়াইন নাকি যে জাল বিছাইলেই ফাল ফাইরা উঠবো। টান হারামির পুতেরা। সুকুমারের ধমকে জেলেরা সচল হয়ে ওঠে। ততোক্ষণে পাশের নৌকার জেলেদের মাছ পাওয়ার আওয়াজ ভেসে আসে। সুকুমার আমাদের অন্য একটা নৌকা থেকে চারটে ইলিশ কিনে দেয়। জশলদিয়া নামিয়ে বলে মাস্টারসাব মন খারাপ কইরেন না। সব দিন আমরাও মাছ পাই না। আবার অনেকদিন আহে ঝাঁকে ঝাঁকে দল বাইন্ধা আহে। আপনি আরেকদিন আইয়েন কুফা টুফা কিচ্ছু না। আমরা মাছ নিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে রাত দুইটা। ঝর্না আপু মাছ ভেজে আমাদের খেতে দিলেন। খেয়েই শুয়ে পড়লাম। ঘুম চোখে আগেই এসে বসেছিল। চোখের পাতা জোড়া হতেই আর কিছু মনে নেই। সকালে কেউ জাগায়নি। সবাই জানে রাতে আমরা ইলিশ অভিযানে গিয়েছি তাই আজ কলেজে দেরিতে যাবো। কিন্তু সারয়ার ভাই আমার কাপড়চোপড় সবকিছু গোছগাছ করছে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, কি করছেন! বললেন, তোমার লজিং আপাতত ক্লোজ। দেখো কে এসেছে তোমাকে নিতে। চোখ কচলে ভেতরবাড়ির ড্রয়িংরুমে গিয়ে আরেকদফা বিস্ময়ের পালা। আব্বা আর মন্টু স্যার এসেছেন আমাকেলজিং থেকে ফিরিয়ে নিতে। ঝর্না আপু আব্বার সরাসরি ছাত্রী সেই হিসেবে আমি তাঁর ভাইই। সারয়ার ভাই জানালেন তাঁর চাকরি আরও তিন বছরের জন্য নবায়ন হয়েছে। পুরো পরিবার নিয়ে পরের সপ্তায় তিনি চলে যাবেন আইভরিকোস্ট। মৌরিতানিয়াও খুব বেশি দুরের নয়।
Development by: webnewsdesign.com